সিরিয়ায় আরও তেজোদীপ্ত বিদ্রোহীরা

সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর দখলের কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশটির আরেক শহর হামার দখল নিয়েছে বিদ্রোহীরা। বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার হামা থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী। আর এর মাধ্যমে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর পর দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় শহর হামাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তার মিত্ররা।

হামার নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার করে সিরিয়ার সেনাবাহিনী। আলেপ্পো ও রাজধানী দামেস্কের মধ্যে অবস্থিত কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হামা। শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এবার সিরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর হোমসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে হায়াত তাহরির আল শামের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা। সিরিয়ার সেনাবাহিনী হামা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার পর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিদ্রোহীরা। ইসলামপন্থি গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শাম এর নেতা আবু মোহাম্মদ আল জোলানি হামাতে বিজয় ঘোষণা করেছেন। বিদ্রোহীরা জানিয়েছেন, তারা হামার কেন্দ্রীয় কারাগার নিজেদের আয়ত্তে নিয়েছেন এবং বন্দিদের ছেড়ে দিয়েছেন।

হামার দখল হারানোকে আসাদ সরকারের জন্য একটি বিশাল ও ব্যাপক ধাক্কা বলে অভিহিত করেছেন থিংক-ট্যাংক সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক অ্যারন লুন্দ। তিনি মনে করেন, সেখানে সেনাবাহিনী থেকে গেলে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো সহজ হতো। তবে তারা সেটি পারেনি। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধের পুরোটা সময় হামা শহর আসাদ সরকারের হাতে ছিল। কিন্তু এখন শহরটির পতন হওয়া দামেস্কের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল। হামা শহরটি ১০ লাখ লোকের আবাসস্থল। এটি আলেপ্পো থেকে ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। আর রাজধানী দামেস্কের প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হামা শহরটি। ফলে আলেপ্পো ও রাজধানী দামেস্কের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হামা। ১৯৮২ সালে এই শহরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থি অভ্যুত্থান ঘটেছিল। সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংস দমনপীড়নের মাধ্যমে সেই অভ্যুত্থানের অবসান হয়েছিল। সেই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এক ভিডিও বার্তায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি বলেন, সিরিয়া ৪০ ধরে যে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে তা দূর করতে তার যোদ্ধারা হামায় ঢুকেছেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বাবা মুসলিম ব্রাদারহুডকে দমনের নামে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন সেটিরই ইঙ্গিত দেন তিনি। এদিকে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির প্রতি সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই আহ্বান জানান। সম্প্রতি শক্তিশালী সশস্ত্র একটি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সিরিয়াকে সাহায্য করতে ইরাক থেকে সেনা পাঠানোর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা এই অনুরোধ জানালেন বিদ্রোহীদের নেতা। গত সোমবার সিরিয়াকে সাহায্য করতে ইরাক থেকে সেনা পাঠানোর অনুরোধ জানায় ইরান সমর্থিত শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতেব হিজবুল্লাহ। কাতেব ইরান সমর্থিত সাবেক আধা সামরিক বাহিনীগুলোর জোট হাশেদ আল শাবির অংশ। বর্তমানে গোষ্ঠীটি ইরাকের নিয়মিত সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত। তবে ইরাক জানিয়েছে, তারা সিরিয়ার সঙ্গে থাকা তাদের ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে সাঁজোয়া যান পাঠিয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীকে শিয়া আল-সুদানির উদ্দেশ্যে ভিডিও বার্তায় সিরিয়ায় বর্তমানে যা ঘটছে তাতে না জড়ানোর হুঁশিয়ারি দেন জোলানি। তিনি বলেন, সিরিয়ায় যা ঘটছে তাতে হস্তক্ষেপ করা থেকে হাশেদ আল-শাবিকে বিরত রাখুন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, ইরান সমর্থিত প্রায় ২০০ ইরাকি যোদ্ধা সিরিয়ার সরকারকে সাহায্য করতে দেশটিতে প্রবেশ করেছে।