আলু চাষের ভরা মৌসুমে হঠাৎ সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং ভালোমানের বীজের সংকট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন রাজশাহী অঞ্চলের আলুচাষিরা। কোথাও চাহিদা মতো সার না মিলছে না। ক্ষেত্র বিশেষে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়েও সার কিনছেন অনেকেই। আবার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বীজ সরবরাহ না করার ভালো বীজ পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় আছেন কৃষকরা।
সার সংকটের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাড়তি ফলনের আশায় অনেকেই অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেছেন, ফলে সার সংকট দেখা দিচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বাড়তি সার প্রয়োগ না করতে তারা চাষিদের নিয়ে গ্রুপ মিটিং করেছেন। তবে চাষিদের ভাষ্য, সচেতনতা বাড়াতে সরকারের উদ্যোগগুলো অপর্যাপ্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ মৌসুমে রাজশাহীতে আলু উৎপাদিত হয়েছে ৯ লাখ টন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছিল। তবে আলু চাষের হিড়িক পড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত আরও সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকূল থাকলে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় আলু ফলনের এ লক্ষ্যমাত্রা সর্বোচ্চ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেকর্ড উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থাকা থাকলেও বিএডিসি এবং বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন চলতি মৌসুমে বীজ ও সার বরাদ্দ বাড়ায়নি। ফলে আলুবীজ ও সারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত বীজ ও সারের দাম বৃদ্ধির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, ডিলাররা বরাদ্দ কম থাকায় অজুহাতে তাদের কাছ থেকে প্রতি বস্তা সারের ৪৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিচ্ছেন। তানোর উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের কৃষিজমিতে কখন এবং কতটা সার প্রয়োগ করতে হবে, তা আমরা আসলে জানি না। বর্তমানে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করি। তারা দুটি বস্তা (১০০ কেজি) এমওপি (মিউরেট অব পটাশ), এক বস্তা (৫০ কেজি) ড্যাপ (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) এবং এক বস্তা টিএসপি (ট্রিপল সুপারফসফেট) প্রতি বিঘা জমিতে আলুবীজ রোপণের আগে ব্যবহার করি। আলুর পাতা গজালে আমরা আবার অল্প পরিমাণ সার দিই।
তিনি বলেন, আমার ১৫ বিঘা জমিতে আলু চাষের জন্য ৩০ বস্তা এমওপি, ১৫ বস্তা ড্যাপ এবং ১৫ বস্তা টিএসপি প্রয়োজন। বিসিআইসি ডিলারের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও সরকার নির্ধারিত দামে মাত্র এক বস্তা এমওপি সার পেয়েছি।
একই উপজেলার আরেক কৃষক মোস্তাকিন ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে আলুবীজ লাগানোর আগে দুই বস্তা এমওপি, দেড় বস্তা ড্যাপ এবং আধা বস্তা টিএসপি প্রয়োগ করছি। আমরা যত বেশি সার ব্যবহার করব, মৌসুম শেষে তত বেশি ফলন পাব।
আলু চাষের জন্য জমিতে কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে সে বিষয়ে কৃষি বিভাগের কেউ যোগাযোগ করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
বাগমারা উপজেলার কৃষক খোরশেদ আলম জানান, তারাও প্রতি বিঘা জমিতে দুই বস্তা এমওপি এবং এক বস্তা টিএসপি ও ড্যাপ প্রয়োগ করছেন। বেশি ফলন পাওয়ার লক্ষ্যে তারা আলুক্ষেতে সার প্রয়োগে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
এদিকে পবা উপজেলার বায়া বাজারের একটি বিসিআইসি ডিলারের দোকানে সরেজমিন দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার টাকার এমওপি ১ হাজার ১৮০ টাকায়, ১ হাজার ৫০ টাকার ড্যাপ ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১ হাজার ৫০ টাকার টিএসপি ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দোকানে কর্মরত এক কর্মচারী বলেন, কৃষকদের চাহিদার বিপরীতে বিসিআইসির বরাদ্দ খুবই কম হওয়ায় তারা অন্য জায়গা থেকে সার সংগ্রহ করেছেন। যখন একজন কৃষকেরই ২০০ বস্তার প্রয়োজন হয়, তখন প্রত্যেক ডিলারের জন্য মোট ১২০ বস্তা টিএসপি বরাদ্দ করা হয়েছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক কাওসার আলী বলেন, প্রতি বিঘা জমি আলু চাষের উপযোগী করতে ২০ থেকে ২৫ কেজি এমওপি এবং টিএসপি বা ড্যাপই যথেষ্ট। সচেতনতার অভাবে কৃষকরা অতিরিক্ত সার ব্যবহার করছেন, যা সারের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে কৃষকদের শুধু আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, ফসলি জমির ওপরের মাটিও নষ্ট হচ্ছে, ফলে উৎপাদন কম হচ্ছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে সালমা বলেন, আমরা কৃষকদের সচেতন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, যাতে তারা তাদের ফসলি জমিতে অনুমোদিত মাত্রার সার প্রয়োগ করতে পারেন। আমরা প্রতিনিয়ত কৃষকদের সঙ্গে গ্রুপ মিটিং ও ইয়ার্ড মিটিং করছি। জমিতে যাতে অনুমোদিত মাত্রার বেশি সার প্রয়োগ করা না হয় তা নিশ্চিত করতে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।