জ্বর ছিল না। রক্তে প্লাটিলেটও ঠিক ছিল। শুধু রক্তচাপ কমছিল। শেষে এতই কমে যায় যে, ঠিকমতো স্যালাইনও নিতে পারে না শরীর। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে শরীর। ফুসফুসে পানি জমে যায়। হাসপাতালের বিছানায় মেয়েকে জড়িয়ে রাতভর নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে বাবা-মা। এক সময় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নিভে যায় আরেক আলো শিশু রিফাহ’র জীবন প্রদীপ।
রিফাহ নানজীবা। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধানম-ি প্রভাতি শাখার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। থাকত মিরপুর-১ নম্বরে। দুই বোনের মধ্যে সেই বড়। ছোট বোন একই স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই শনাক্তের মাত্র চার দিনেই ডেঙ্গুতে মারা যায় শিশু রিফাহ। রিফাহর বাবা রায়হানুল হক। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের এটুআইয়ের একজন কনসালট্যান্ট। বাড়ি গাইবান্ধা। রিফাহকে গাইবান্ধায় দাফন করা হয়েছে।
রিফাহর বাবা জানান, এবারই প্রথম ডেঙ্গু হয়েছিল শিশুটির। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে একবার জ্বর হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ আসে। এবার ঠিক কীভাবে আক্রান্ত হলো, তা বুঝতে পারছেন না তিনি।
রায়হানুল হক বলেন, ‘২২ নভেম্বর শুক্রবার সকালে রিফাহর জ্বর আসে। নাপা দিই জ¦র কমার জন্য। একবার কমে গেল। পরে আবার জ্বর এলো। পরদিন শনিবার ডাক্তার দেখাই ও ডেঙ্গু টেস্ট করি। সেদিন রাতে আবার জ্বর চলে যায়। পরদিন রবিবার। জ্বর নেই। কিন্তু শরীর খুব দুর্বল। বিছানা থেকে উঠতে পারে না। শুয়ে থাকে। আমি অফিসে না গিয়ে ওর সঙ্গে শুয়ে থাকলাম। পরে সন্ধ্যায় চিকিৎসকের কাছে যাই ও রিপোর্টে ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। কোনো উপসর্গ না থাকলেও মেয়েটার অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। চিকিৎসক বললেন যে, অবস্থা ভালো না, পালস কমে আসছে, রক্তচাপ কমে আসছে। ওকে হাসপাতালে ভর্তি করান।’
তিনি জানান, প্রথমে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় রিফাহকে। সেখানে স্যালাইন দেওয়া হয়। ওর রক্তচাপ পাওয়া যায়। কিন্তু পরদিন সোমবার আবার রক্তচাপ কমে যায়। তখন শিশু হাসপাতাল থেকে বলে সেখানে আইসিইউ আছে কিন্তু বেড ফাঁকা নেই। আইসিইউ লাগবে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, তারা শিশুটির আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসা শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু মনিটর নেই, তাই মনিটরিংটা করতে পারছেন না। আইসিইউতে নিয়ে যেতে হবে। সেদিনই ধানম-ির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় রিফাহকে। সেখানে আইসিইউ বেড পাওয়া যায় ও ওকে ভর্তি করানো হয়। সেখানে সেদিন বিকেল পর্যন্ত শরীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু রাতে আবার খারাপ হয়। তারপরের দিন মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে মারা যায় শিশুটি।
বাবা রায়হানুল হক বলেন, ‘প্লাটিলেট নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। যেদিন ডেঙ্গু হয়, সেদিন প্লাটিলেট ছিল ২ লাখ ৫ হাজার। তারপর শিশু হাসপাতালে কমে হয়েছিল ৮৫ হাজার। আবার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার। ওর সমস্যা ছিল ওর রক্তচাপ কমে যাচ্ছিল। প্রেশার না থাকার কারণে ফুসফুসে পানি জমে যায়। সে কারণে স্যালাইন দিলেও তা পাস হচ্ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুর আগের মধ্যরাতে হঠাৎ ওর পানি তেষ্টা পায়। আমরা দুজন (বাবা-মা) ওর দুপাশে। ডাক্তাররা পানি দিতে বারণ করেছেন। কিন্তু মেয়েটা পানির জন্য আবদার ধরে। শেষে ওকে পানি দেয় ওর মা। সেই ওর শেষ পানি।’
রিফাহকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে রায়হানুল বলেন, ‘মেয়েটা আমার খুবই শান্তশিষ্ট। লেখাপড়ায়ও ভালো ছিল। ছবি আঁকত। কত স্বপ্ন ছিল ওকে নিয়ে। সবকিছু মিথ্যা করে আমাদের একা করে চলে গেল মেয়েটা।’
ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু : দেশে ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও পাঁচজন মারা গেছে। তাদের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে তিনজন এবং চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে একজন করে চিকিৎসাধীন ছিল। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও দুজন পুরুষ। এ নিয়ে এ মাসের গত সাত দিনে ৩৪ জন ও এ বছর ৫২২ জন মারা গেল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ৫৬২ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৬৪ পুরুষ ও ১৯৮ নারী। রোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩৬ জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এরপর ঢাকা উত্তরে ভর্তি হয়েছে ১২৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৮, ঢাকা বিভাগে ৬৪, বরিশাল বিভাগে ৫৩, খুলনা বিভাগে ৪৭, রাজশাহী বিভাগে ৩৭, ময়মনসিংহে ১৮, সিলেটে চার ও রংপুরে দুজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে।
এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৯৫ হাজার ৬৩২ জন। তাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ শতাংশ নারী। সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা উত্তর সিটিতে ২০ হাজার ২০২, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৭ হাজার ৫৬৯ ও তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮৪৩ জন। মোট রোগীর এই সংখ্যা ডেঙ্গুর গত ২৪ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রোগী ছিল গত বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।
এ বছর এখন পর্যন্ত যে ৫২২ জন মারা গেছে, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী এবং ৪৮ পুরুষ। ঢাকা দক্ষিণে চিকিৎসাধীন রোগীরাই বেশি মারা গেছে। এই সংখ্যা ২১৯ জন। এরপর ঢাকা উত্তরে ৯৬, বরিশাল বিভাগে ৫৭, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫০, ঢাকা বিভাগে ৪৭, খুলনা বিভাগে ৩০, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩, রাজশাহী বিভাগে সাত, রংপুর বিভাগে দুজন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে একজন চিকিৎসাধীন রোগী মারা যায়। মোট মৃত্যুর এই সংখ্যা দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মারা গেছে গত বছর ১ হাজার ৭০৫ জন।