সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৩ শতাংশ শিক্ষকই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে পোষ্য কোটা থাকছে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল রবিবার খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বিভাগটির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হবে নাকি জনপ্রশাসনের সবশেষ কোটা বণ্টনের প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। অবশেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিষয়টি স্পষ্ট করলেন।
উপদেষ্টা বলেন, সাধারণভাবে অন্য চাকরিতে যেমন ৭ শতাংশ কোটা রয়েছে, এখানেও তা থাকবে। তবে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও গণিতে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মোট নিয়োগের ২০ শতাংশ গণিত ও বিজ্ঞানের বিষয়গুলো থেকে পাস করাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গাইড বই ও প্রাইভেট কোচিংয়ের বিষয়টি নিরুৎসাহিত করতে হবে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গত ২১ জুলাই কোটার নতুন বিন্যাস ঠিক করে রায় দেয় হাইকোর্ট। এক দিন বাদে ওই রায় অনুযায়ী সব গ্রেডের নিয়োগে ৭ শতাংশ কোটা রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এর মধ্যে আছে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা। আদালত রায় দেওয়ার দুদিন পর ২৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানায়, কোটাসংক্রান্ত আগের সব পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন, আদেশ, নির্দেশ, অনুশাসন রহিত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুসারে, সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরির সব গ্রেডে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে ৯৩ শতাংশ। বাকি ৭ শতাংশ নিয়োগ কোটার ভিত্তিতে হবে।
প্রাথমিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে আগে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯’ অনুসারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো। সেই নিয়োগ বিধিমালা-২০১৯-এ বলা হয়েছে, একটি উপজেলার মোট পদের ৬০ শতাংশ নারী, ২০ শতাংশ পোষ্য ও ২০ শতাংশ পুরুষ কোটা নির্ধারিত থাকবে। নারী, পোষ্য ও পুরুষÑ এ তিন ধরনের কোটা পূরণের ক্ষেত্রে আবার চার ধরনের কোটা অনুসরণ করতে হতো। সেগুলো হলো এতিমখানা নিবাসী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ১০ শতাংশ, বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান ৩০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ৫ শতাংশ এবং আনসার ও ভিডিপি সদস্য ১০ শতাংশ।
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে উপবৃত্তি চালু করা হয়েছে। এতে বিশাল ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু এটি যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সেখানে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। উপদেষ্টা জানান, উপবৃত্তির জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নাম থাকে, কিন্তু তারা অন্য স্কুলে অধ্যয়ন করছে এমনও অভিযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ৬০ শতাংশ নারী। এক দিনে নারীদের এত বেশি কোটা দেওয়া হয়নি। ধাপে ধাপে নারীদের কোটা বাড়ানো হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা শিশু। শিশুদের সঙ্গে লালনপালনের পাশাপাশি বেড়ে ওঠার পর্যায়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও নারীর সহজাত সম্পর্ক রয়েছে। তাদের এ স্থান পুরুষরা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেন না। তাছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নেও অধিক কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত নারীর কর্মসংস্থানের একটি আদর্শ ক্ষেত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। কারণ কাজটি অনেকটা স্থানীয় পর্যায়ে। আর কর্মঘণ্টাও প্রকৃতপক্ষে কম। এসব যুক্তিতেই প্রাথমিকে নারীদের ৬০ শতাংশ কোটা দেওয়া হয়। তবে বাস্তবতা পরিবর্তনশীল। নারীরাও লেখাপড়ায় এগিয়েছে। পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় ভালো ফল করছে। কর্মসংস্থানেও তারা এগিয়েছে। এসব কারণে সরকার অনেক দিন ধরেই প্রাথমিকে নারীর কোটা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছিল।