চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার উত্তর গুজরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার মৌসুমি বড়ুয়ার বিরুদ্ধে জমির নামজারির প্রস্তাব তৈরি, খাজনা আদায়সহ নানা খাতে ইচ্ছেমতো ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাহিদামতো ঘুষ না দিলে কোনো ফাইল ধরেন না মৌসুমি বড়ুয়া।
জানা গেছে, তিন বছরের বেশি সময় ধরে এই ভূমি অফিসেই কর্মরত মৌসুমি বড়ুয়া। সম্প্রতি বদলির আদেশ জারি করা হলেও এখান থেকে নড়ছেন না তিনি। নামজারি, খতিয়ান যাচাই, বন্দোবস্তি তদন্তসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে সেবাপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
মৌসুমির দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে অন্তত পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তাদের একজন আবুল হাসনাত মো. রজব উল্লাহ। অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালে উত্তর গুজরা মৌজায় বিএস জরিপের ৫২৩২ নম্বর খতিয়ানের অধীন ১৭২৬৭ এবং ১৭২৬৮ দাগের ২৪ শতক খাস জমি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে ৯৯ বছরের জন্য বন্দোবস্তি নেয় হযরত রূপচাঁন্দ শাহ জামে মসজিদ কমিটি। ৩১ বছর ধরে উক্ত জমির খাজনা পরিশোধ করে আসছিল মসজিদ কমিটি।’
রজব উল্লাহ আরও বলেন, ‘সবশেষ ২০২১ সালে (১৪২৮ বাংলা) পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ১৪২৯ বাংলা সনের খাজনা পরিশোধ করতে গেলে নানা টালবাহানা করতে থাকেন মৌসুমি। গত তিন বছর ধরে কোনো কারণ ছাড়াই তিনি খাজনা নিচ্ছেন না। এলাকার বিশেষ একটি মহলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে মৌসুমি খাজনা নিচ্ছেন না।’
সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে মৌসুমির বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মহোদয় খাজনা আদায়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে উপজেলা এসিল্যান্ডকে বলেও দিয়েছেন। কিন্তু মৌসুমি কোনো কথাই আমলে নিচ্ছেন না বলে জানান আবুল হাসনাত মোহাম্মদ রজব উল্লাহ।
উত্তর গুজরার বাসিন্দা মো. ফোরকান ফারুকি বলেন, ‘ক্রয়সূত্রে এবং পৈতৃক সম্পত্তির বণ্টননামা সূত্রে প্রাপ্ত আনুমানিক ৬ শতক জমি নামজারির জন্য মৌসুমি বড়ুয়া আমার কাছ থেকে ১৬ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করেছেন। নামজারির জন্য অনেকের কাছ থেকে ২০-৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিচ্ছেন মৌসুমি বড়ুয়া।’
জানা গেছে, নামজারির সরকারি ফি ব্যয় হওয়ার কথা ১ হাজার ১৭০ টাকা। নাম প্রকাশ না করে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার দুটি নামজারির আবেদন ছিল উত্তর গুজরা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। সব ঠিকঠাক থাকার পরও তহসিলদার আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। চাহিদামতো ঘুষ না দিলে তিনি (মৌসুমি) হয়রানি করেন।’
রূপচাঁদ শাহ জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে গত তিন বছর ধরে খাজনা না নেওয়া প্রসঙ্গে তহসিলদার মৌসুমি বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএস ৫২৩২ খতিয়ানে ১৭২৬৭ ও ১৭২৬৮ দাগের ২৪ শতক জমি সরকারি খাস সম্পত্তি হলেও শ্রেণি ‘অকৃষি’। অনলাইন সিস্টেম হওয়ার আগে ‘দোকান’ হিসেবে ম্যানুয়ালি খাজনা নেওয়া হতো। খাজনা পরিশোধের জন্য অনলাইন আবেদনে জমির শ্রেণি উল্লেখ করতে হয়। অনলাইন আবেদনে জমির শ্রেণি ঠিক করে দিতে উপজেলা এসিল্যান্ড বরাবর রূপচাঁন্দ শাহ জামে মসজিদ কমিটিকে একটি লিখিত আবেদন দিতে বলেছি। ওই আবেদন আমার কাছে এলে এসিল্যান্ড স্যারের কাছে প্রতিবেদন দেব। এরপর ঠিক হয়ে গেলে অনলাইনে খাজনা পরিশোধ করতে পারবেন মসজিদ কমিটি।’
কোনো মহলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে মসজিদ কমিটির পক্ষে খাজনা আদায় না করার অভিযোগ সঠিক নয়। নামজারি ও খাজনা আদায়ে ঘুষ নেওয়া এবং হয়রানির অভিযোগও মিথ্যা বলে জানান মৌসুমি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাউজান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিদওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘বিএস ৫২৩২ খতিয়ানের অধীন ২৪ শতক জায়গার খাজনা পরিশোধে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে রূপচাঁদ শাহ জামে মসজিদ কমিটিকে লিখিত আবেদন করতে বলেছি। নামজারির প্রস্তাব তৈরিতে তহসলিদার মৌসুমির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’