আসাদ বিরোধীদের দামেস্ক দখলের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় সরকারের পতন ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ পালিয়ে গিয়ে রাশিয়ায় সপরিবারে রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। মাত্র ১২ দিনের অভিযানে অনেকটা বিনা বাধায় প্রথমে সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদ্রোহীরা। আসাদ বিরোধী এ অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে বিদ্রোহী ও উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শাম। আলেপ্পোর পর দেশটির আরেক শহর হামার দখলে নেওয়ার পর থেকেই বাশার আল আসাদের পতনের গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, যার শেষটা হয়েছে বিদ্রোহীদের রাজধানী দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মধ্য দিয়ে। বিদ্রোহীদের অগ্রসরের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ক্ষমতার অবসান হলো। আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশটির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, সে নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে রাজনৈতিক পুনর্গঠন, অন্যদিকে আঞ্চলিক নানা জটিলতা সামলাতে হবে পশ্চিম এশিয়ার দেশটিকে। বিদ্রোহীদের এ অভিযানের পেছনে রয়েছে তেল আবিবের বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণা। আসাদ সরকারের পতনের জন্য কৃতিত্ব দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এমন দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও। ১৯৭১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিরিয়ায় ক্ষমতায় ছিলেন বাশারের বাবা হাফিজ আল আসাদ। বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতার মসনদে বসেন বাশার। প্রথমে সংস্কারের পথ ধরে এগোলেও পরে বাবার মতোই কর্র্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত হন। তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের দমনে ব্যাপক নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এর জের ধরে আরব বসন্তের সময় ২০১১ সালে বাশারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। এক সময় তা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। সে গৃহযুদ্ধই চলছিল প্রায় ১৩ বছর ধরে। দুই মিত্র রাশিয়া ও ইরানের সহযোগিতায় ২০২০ সাল থেকে ইদলিব ছাড়া দেশটির প্রায় সব বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছিল আসাদ বাহিনী। তবে দুই মিত্রের সহায়তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট বাশার দুই সপ্তাহও ক্ষমতায় টিকতে না পারায় আসাদের দুর্বলতাগুলো দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের শঙ্কা, সিরিয়ার এ সংকট থেকে নিজেদের ফায়দা আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ইসরায়েল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইসরায়েলি লেখক আভি লিপকিনের একটি সাক্ষাৎকার বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, এমন এক দিন আসবে যেদিন আমাদের সীমানা লেবানন থেকে সৌদি আরবের বিশাল মরুভূমি, ভূমধ্যসাগর থেকে ফোরাত নদী (ইরাক) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। সেই বক্তব্যের পর থেকে বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণাটি নতুন করে সামনে এসেছে।
ইসরায়েলের অনেক উগ্র জায়নিস্টরা এই অঞ্চলটিকে এরেৎজ ইসরায়েল বা বৃহত্তর ইসরায়েল মনে করে, যা কি না ইসরায়েলের বর্তমান সীমানা থেকেও অনেক বড় একটি ভৌগোলিক এলাকা। তবে বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণাটি নতুন নয়। ইহুদিবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জলের মতে, প্রমিজড ল্যান্ড বা প্রতিশ্রুত ভূমির মানচিত্রে মিসরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত। প্রতিশ্রুত এ ভূখণ্ডের মানচিত্রে জর্ডান, ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এবং মিসরের অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইহুদি ধর্ম অনুযায়ী, বৃহত্তর ইসরায়েল বলতে মধ্যপ্রাচ্যের সেই সব প্রাচীন এলাকাকে বোঝানো হয় যেগুলো একসময় অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ইহুদীদের উৎপত্তি ইরাকে উত্তর নগরী থেকে। যেখানে আব্রাহাম ও তার পূর্ব পুরুষের বসবাস ছিল।
বাশারের অচিন্তনীয় পতনের পর সিরিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু দেশটির জনগণের ওপর নয়, মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা বিশ্বের রাজনীতির ওপরই প্রভাব ফেলেছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্রে ছিল আসাদের সিরিয়া। শিয়া প্রধান রাষ্ট্র ইরানের স্বার্থ রক্ষায় পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের বাফার রাষ্ট্র ছিল এটি। ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না জড়ালেও লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র পাঠানোর রুট হিসাবে কাজ করে যাচ্ছিল সিরিয়া। ইরানের সমর্থন আর রাশিয়ার অস্ত্রে বিদ্রোহীদের দমন করে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন বাশার। তার পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল লেবাননের হিজবুল্লাহও। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তারা সবাই এখন বিপাকে। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হিজবুল্লাহ ও ইরান। এখন ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত রাশিয়া। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে হিজবুল্লাহর শক্তি কমে আসাকেও বাশারের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিত্র বাশারের পতনকে ইরানের জন্য একটি বড় আঘাত হিসাবেই দেখা হচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পক্ষে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হিজবুল্লাহ ও হামাস এখন যুদ্ধ ক্লান্ত। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীরা থাকলেও তারাও বিমান হামলা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তবুও অদম্য শত্রু বাশারের পতনে ইসরায়েলিদের খুশি হওয়ার কথা থাকলেও, ততটা খুশি দৃশ্যত তারা নয়। উত্তর সীমান্তে ইসলামী জিহাদিদের বিজয়ে তাদের কিঞ্চিৎ দ্বিধা আছে।
এক সময় আল কায়দার শাখা ছিল এইচটিএস। ২০১৬ সালে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের পর নিজেদের উগ্র মতাদর্শ বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গোষ্ঠীটির এ রূপান্তরকে বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখেছেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে গোলান মালভূমির বেশির ভাগই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ১৮৮১ সালে দখলীকৃত এলাকা আরও বাড়ায় জায়নবাদী রাষ্ট্রটি। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী সিরিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে সীমান্তে পাহারা জোরদার করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিরিয়া সীমান্তের বাফার জোনে সেনা পাঠিয়েছেন এবং গোলান মালভূমির তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা সিরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে বলেছেন। ১৯৭৪ সালের পর এই প্রথম বাফার জোনে ইসরায়েলি সেনারা ঢুকল। সিরিয়ার আরেক প্রতিবেশী দেশ লেবাননও তাদের সীমান্তে পাহারা মজবুত করেছে। ধারণা করা হয় সিরীয় বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক তৎপরতা তুরস্কের সহায়তা ছাড়া সম্ভবই হতো না। সিরিয়ার বিভিন্ন বিদ্রোহী দলকে সহায়তা করলেও এইচটিএসকে মদদের অভিযোগ অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশ তুরস্ক। ন্যাটোর মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সিরিয়া পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার কথা বলেছেন। আর ভাবী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেই দিয়েছেন, সিরিয়ায় কোনো যুদ্ধে জড়াবে না যুক্তরাষ্ট্র।
দীর্ঘকাল ধরে বাশারকে সমর্থন জোগানো রাশিয়া বিবৃতিতে বিদ্রোহী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বাশার আল আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় রাশিয়ার অগ্রণী ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছে বিবিসি তথা পুরো পাশ্চাত্য। ফলে সিরিয়ার সরকার পতনের বিষয়টি রাশিয়ার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তুমুল গৃহযুদ্ধের জেরে ২০১৫ সালে পতনের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ। সে সময় তাকে রক্ষা করার জন্য সেনা ও যুদ্ধ বিমান পাঠিয়েছিল রাশিয়া।
অবশ্য সিরিয়ায় রুশ সেনা পাঠানোর পেছনে মস্কোর কিছু উদ্দেশ্য ছিল। এর মধ্যে একটি হলো বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দেওয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতি এটি ছিল রাশিয়ার ছুড়ে দেওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাশার আল-আসাদ সরকারকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিনিময়ে সিরিয়ার কর্র্তৃপক্ষ রাশিয়াকে হোমেইমিমের বিমানঘাঁটি ও তারতুসের একটি নৌঘাঁটি ৪৯ বছরের জন্য ইজারা দেয় সিরিয়া। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরির সুযোগ পায়। এসব ঘাঁটি আফ্রিকায় সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মস্কোর জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো, সিরিয়ায় রাশিয়ার ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? তবে ঘাঁটিগুলোতে কোন আক্রমণ করা হবে না বলে বিদ্রোহী পক্ষ জানিয়েছে।
বাশার আল-আসাদের মস্কোয় যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সিরিয়ার সশস্ত্র বিরোধী প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন রাশিয়ার কর্মকর্তারা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিরিয়ায় অবস্থিত রুশ ঘাঁটিগুলোকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সিরিয়ার বিরোধী নেতারা দেশটিতে রুশ সামরিক ঘাঁটি ও কূটনৈতিক মিসনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তবে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন- আপাত দৃষ্টিতে গৃহযুদ্ধের অবসান হলেও, এটি সিরিয়া যুদ্ধের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।