২৫০টির বেশি বিমান হামলা ইসরায়েলের

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের মাধ্যমে দেশটিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছে। দেশটির সামনে এখন যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের শাসনামলে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এরই মধ্যে সিরিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এর মধ্যেও ক্রমাগত বিদেশি শক্তির হামলার শিকার হচ্ছে সিরিয়া। আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে সিরিয়া লক্ষ্য করে লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশই আসাদ যুগ-পরবর্তী সময়ে আইএস যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেটিকে হামলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেই সঙ্গে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের উপায় খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন।

ইসরায়েলে হামলা : সিরিয়ার ভূখণ্ডে ২৫০টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ইসরায়েলি আর্মি রেডিও সূত্রের নাম গোপন রেখে জানায়, সিরিয়ার ভূখণ্ডে ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দেশটির বিমানবাহিনীর ইতিহাসে এটা সিরিয়ায় অন্যতম বড় হামলার ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছে আর্মি রেডিও। সূত্রটি জানিয়েছে, বাশার আল-আসাদের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি, কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান, ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, উৎপাদন ক্ষেত্র, ওয়্যারহাউজ এবং ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সারে বলেছেন, সিরিয়ায় সন্দেহভাজন রাসায়নিক অস্ত্র স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে। এসব অস্ত্র যাতে শত্রুদের হাতে না পৌঁছায়, সেজন্য এ হামলা চালানো হয়। বিমান হামলার পাশাপাশি সিরিয়া সীমান্তের বাফার জোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তেল আবিব। সেই সঙ্গে গোলান মালভূমির সিরিয়া অংশের হারমন পর্বতের দখলও নিয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনী। সেই সঙ্গে গোলান মালভূমিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এমনকি দামেস্ক সীমান্তে ইসরায়েলি ট্যাংকের উপস্থিতিও দেখা গেছে। যার ফলে তেল আবিবের বিরুদ্ধে সিরিয়ার ভূখণ্ড দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েলের ভূমি দখলের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরাক, কাতার ও সৌদি আরব। এটিকে ১৯৭৪ সালের চুক্তি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ। তবে নেতানিয়াহু দাবি, সিরিয়ায় সরকার পতনের ফলে সেই চুক্তির আর কোনো মূল্য নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা : সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন বিমান হামলার খবর নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটনও। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, আসাদ যুগ-পরবর্তী সময়ে আইএস যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে সেজন্য ৭৫টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে বিদ্রোহী জোটের প্রধান গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ। তবে সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের উপায় খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র। সে লক্ষ্যে তুরস্কসহ আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাইডেন প্রশাসন। যাতে সিরিয়ার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কূটনীতি শুরু করা যায়। পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেন, ওয়াশিংটনের হাতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগের অনেক উপায় আছে। গত কয়েক দিন ধরেই আমরা এ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও সিরিয়ার অভ্যন্তরে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

সরকার গঠন প্রক্রিয়া : সিরিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে তৎপরতা শুরু করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। ক্ষমতাচ্যুত বাশার আল-আসাদের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জালালি সোমবার বিদ্রোহীদের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হয়েছেন। এরই মধ্যে আসাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জালালি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ফয়সাল মেকদাদের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি। আলজাজিরা জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল বাশির। সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে হায়াত তাহরির আল-শামস পরিচালিত সিরিয়ান স্যালভেশন গভর্নমেন্টের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

সাধারণ ক্ষমা : ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের শাসনামলে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী। সিরীয় বিদ্রোহীদের যৌথ সামরিক অপারেশন কমান্ড যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলেছে, এই সাধারণ ক্ষমা আসাদ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। উগ্র ইসলামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শাম বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় থাকাকালে উত্তর-পশ্চিমের ইদলিব প্রদেশ ও আশপাশের বেশ কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। তবে গত ২৭ নভেম্বরের পর তারা ঝটিকা আক্রমণ শুরু করে এবং বড় কয়েকটি শহর দখলের পর গত রবিবার রাজধানী দামস্কের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর মধ্য দিয়ে বাশারের দুই যুগের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।