বধ্যভূমি এখন ময়লার ভাগাড়!

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে দেশে বেশ কিছু স্মারক ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়াও দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা বধ্যভূমি। এসব স্মৃতিস্তম্ভ ও বধ্যভূমি সংরক্ষণে নানা পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বছরের অধিকাংশ সময়ই থাকে অযত্ন-অবহেলায়। দেশের অন্যান্য বধ্যভূমির মত বেহাল চট্টগ্রাম মহানগরের ৬১টি বধ্যভূমির। ৬১ টির মধ্যে ৫৮টির স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পাওয়া না গেলেও যে দুইটি দৃশ্যমান আছে সেটিও বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে অন্যতম হালিশহরের নাথ পাড়ায় অবস্থিত বধ্যভূমিকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করেছে আশেপাশের মানুষ।

গত সপ্তাহে সেখানে গিয়ে দেখা যায় কাদামাটি ও ময়লার স্তূপ হয়ে আছে বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি স্তম্ভটি । সেখানে ফেলা হয় আশেপাশের বাসাবাড়ির আবর্জনা,সড়কের ময়লা সাথে লোহা দিয়ে নির্মিত ব্যারিকেডে শুকানো হচ্ছে কাপড়। সন্ধ্যা নামার পর সেখানে কুকুর বিড়ালের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।

বুদ্ধিজীবী দিবসকে কেন্দ্র করে আজ শুক্রবার সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের কয়েকজন তরুণ নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে দেখা যায়। প্রতিবেদককে পেয়ে ক্ষোভের সুরে বলেন, এটি যে ৭১’র মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থাপনা এখানের বসবাসকারীরা তাই জানেন না। তারা এখানে গৃহস্থালির আবর্জনা থেকে শুরু করে এমন কোন ময়লা নেই যে ফেলেন না। আর বুদ্ধিজীবী দিবসের আগে আমরা পরিষ্কার করে দিলেও রাজনৈতিক দলের নেতারা এসে ফুল দিয়ে মোমবাতি প্রজ্বলন করে চলে নিজেদের দায়টুকু সেরে যান কিন্তু সারা বছর আর খোঁজ রাখেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর মধ্যম নাথপাড়া বধ্যভূমিতে মহাপ্রলয় ঘটে গেছে একাত্তরের মার্চের শেষ দিকে। পুরো নাথপাড়ার আশপাশ থেকে নারী, পুরুষদের এক জায়গা জড়ো করে একে একে সবাইকে রাইফেলের গুলিতে হত্যা করে আবার অনেকের দেহ টুকরো টুকরো করে উল্লাস করতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য আর স্থানীয় বিহারিরা মিলে এই  প্রলয়ঙ্করী ঘটনা ঘটিয়েছিল। গণচিতায় পুড়িয়েছে ৪৫ জনের ওপর নরনারীর লাশ। হালিশহরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভয়াবহ গণহত্যার শহীদ ৪৫ জন ব্যক্তির নামফলক রয়েছে ছোট একটি জায়গাতে।

তাঁরা হলেন- শান্তিপদ নাথ, ডা. গৌর চন্দ্র নাথ, হেমন্ত কুমার নাথ, মানিক চন্দ্র নাথ, নারায়ণ চন্দ্র নাথ, সুধাংশু চন্দ্র নাথ, শিউলী রানী দেবী মিনু, সুবল চন্দ্র নাথ, বনমালী  নাথ, নরহরি বৈষ্ণব, রাধাগোবিন্দ নাথ, বাসুদেব বৈষ্ণব, ননীগোপাল নাথ, দীনেশ চন্দ্র নাথ, ক্ষিরোদ চন্দ্র নাথ, দুলাল চন্দ্র নাথ, বাদল চন্দ্র নাথ, মোহাম্মদ ইসহাক, বাবুল হক, আবুল খায়ের, ছিদ্দিক আহমেদ, রমনী মোহন নাথ,  ব্রজেন্দ্র লাল সাহা, গণেশ চন্দ্র নাথ, ক্ষেত্র মোহন নাথ, হরি রঞ্জন নাথ, ধীরেন্দ্র চন্দ্র নাথ কবিরাজ,  সুকোমল নাথ তপন, আলী সওদাগর, আবুল হাসেমসহ আরও অনেক শহীদের নাম রয়েছে ।

ঘটনা স্থলে পরিচ্ছন্নতার কাজ করাদের অন্যতম একজন ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক শুভ দেবনাথ দেশ রূপান্তর কে বলেন,দীর্ঘদিন ধরে এই বধ্যভূমি সহ বাকি ৬০টি সংরক্ষণ এবং উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। গত দুইদিন আগে আমরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছি এবং চট্টগ্রামের মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেনের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়েছিলাম কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই আমরা কয়েজন মিলে আজ পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমে পড়ি।

তিনি আরও বলেন,পরিষ্কার করতে গিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতা চেয়েছিলিম কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। অনেকের সাথে আলাপ করে দেখলাম তাদের ধারনা এটি একটি শ্বশান। আবার অনেকেই জানেন না এখানে কি। কেউ কেউ ফেলেন ময়লা।সারা বছর কেউ খোঁজ না নিলেও আমরা পরিষ্কার করে যাওয়ার পর বিভিন্ন দলের লোকেরা এসে ফুল দিয়ে চলে যান।

মুক্তিযোদ্ধা গবেষণা কেন্দ্রে ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান ড মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, নাথপাড়ার এই বধ্যভূমিটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র থেকে করা হয় ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সালের দিকে। এরপর থেকে প্রশাসন, সরকারের কেউ এদিকে নজর দিয়েছে বলে জানা নেই। আর আমরাও অনেক আন্দোলন করেছি কোন লাভ হয়নি। এই বুড়ো বয়সে এখন আর পারি না । তবে কোনদিন আবার সুযোগ পেলে এসবের জন্য কথা বলব।

তিনি বলেন, কেউ যদি নিজ দায়িত্বে করে দেয় তখন কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসবে। কারণ সেখানে অনেকের ফায়দা আছে। যেখানে ফায়দা নেই সেখানে কেন কেউ আসবে।

বধ্যভূমির পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক মধ্যবয়সী লোক কৌতুহলবশ্ত হয়ে পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম দেখছিলেন,কি আছে জানতে চাইলে বলেন, এখানে তো লোকে ময়লা ফেলে আর পোলাপান খেলে এখন তো অনেক কাঁদা জমে আছে তাই দেখতে দাড়াইছি কি হচ্ছে। পাশে থাকা এক যুবক বধ্যভূমির কথা বললে তিনি বলেন, কই সারা বছর তো কেউ আসে না আর কেউ পরিষ্কার রাখে না তাই বুঝার উপায় নেই এটা কি।

হালিশহর মধ্যম নাথপাড়া বধ্যভূমি গণহত্যায় শহীদ পরিবারের বেশ কিছু সদস্য এখনো বেঁচে আছেন সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে। তারা প্রশ্ন করেন, আপনারা এখন নিজ চোখে দেখছেন না বধ্যভূমিটির কী অবস্থা? বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বহুবার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি।তাই আমরা এখন আর কিছু আশা করি না।