অজিত রায়ের গাওয়া আর আখতার হুসেনের লেখা এই গান যেন বিজয়ের দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়। গানটি প্রথম বিজয় দিবসের আগেই সুর করা শেষ করেছিলেন অজিত রায়।
আজ গান নিয়ে আলাপের আগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নিয়ে এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কামাল লোহানীর একটা লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিল অল ইন্ডিয়া রেডিওর শিলিগুড়ি কেন্দ্রকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করে সেখান থেকে ভাষণ প্রদান করেন এবং এরপরেও বেশ কিছুদিন ওই কেন্দ্র থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণসহ আরও নানা অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় সব সহায়তার সঙ্গে একটি জিনিস চেয়েছিলেন। উনি চেয়েছিলেন, একটি শক্তিশালী প্রচারযন্ত্র। যার ফলে পরবর্তীকালে এই মুজিবনগর সরকারের পরিচালনাধীন একটি বেতার চালু করা হল সেটিও ওই একই নামে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার দেয়, এটি ৫০ কিলোওয়াট ছিল যতদূর জানি। কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নম্বর দোতলা বাড়িটিতে রাষ্ট্রপতি ও অন্য মন্ত্রীদের আবাসের কক্ষের সঙ্গের একটি কক্ষে ওই ট্রান্সমিটার দিয়ে সম্প্রচার শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীরা অন্য বাড়িতে উঠে যাওয়ার পর সেই ৫৭/৮ নম্বর বাড়িটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যালয় রূপে গড়ে ওঠে। এরপর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে। এই কেন্দ্র দুটি ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
এই সম্প্রচার জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে, মানুষ রেডিও লুকিয়ে রাখে সারাদিন আর সন্ধ্যার পর কুলুঙ্গি থেকে বের করে কান পেতে নব ঘোরায়। ২৬ বছর বয়সী তরুণ ছড়াকার আখতার হুসেন লিখলেন স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/রুখবে তাদের কারা, আজ রুখবে তাদের কারা।।// আকাশ বাতাস পথে প্রান্তরে জয়ধ্বনি শোনা যায়/ শৃঙ্খল বেড়ি কে আর পরাবে ওদের কঠিন পায়।/ জীর্ণ ধরার ভিত ধরে ওরা দেবেই দেবে যে নাড়া ।।// জেনেছে ওরা ধুকে ধুকে মরা সেই তো জীবন নয়/ শোষণের বুকে হানছে আঘাত নির্ভীক বরাভয়।// কণ্ঠে ওদের ঘুম ভাঙানিয়া দীপ্ত শপথ গান/ বিপ্লবী ওরা আঁধারের দেশে সূর্যের সন্তান/ মহাকাল আসে মহাকাল দিক দিগন্তে সাড়া।।// আখতার হুসেনের লেখা এ গানটিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণাকারী গান’ হিসেবে শিল্পীরা পরিবেশন করেন।
আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরায়। ছাপা হওয়া তার প্রথম লেখাটি ছিল ছড়া। ‘ব্যাঙের ছানা’ শিরোনামের ওই লেখাটি প্রকাশিত হয় চাঁদের হাটের সংগঠক, বিশিষ্ট ছড়াকার রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সম্পাদনায় অর্ধ সাপ্তাহিক সোনার বাংলায়। দেশের খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক হিসেবে আখতার হুসেন সবার কাছে সমাদৃত। তিনি শিশু-কিশোরদের সংগঠন খেলাঘরের মুখ্য সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক/শান্তির সৈনিক’-এর রচয়িতা। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠন সংগীতও তার লেখা। গানটির সুরকার অজিত রায়। আখতার হুসেনের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমুদ্র অনেক বড়, হৈ হৈ রৈ রৈ, প্রজাপতি ও প্রজাপতি, রামধনুকের সাঁকো, দি টাইগার ও অন্যান্য গল্প, আমার দুটো ডানা, উল্টোপাল্টা, হালচাল, ছোটদের মুকুন্দ দাস।
স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে গানটি সুর করেছেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভুবনে অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তিত্ব, প্রয়াত প্রথিতযশা সংগীতজ্ঞ কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী অজিত রায়। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। রবীন্দ্রসংগীতের এই নামি শিল্পী গণসংগীতও গেয়েছেন সমান দাপটে। চার দশক কালেরও অধিক সময় ধরে তার দৃপ্ত পদচারণায় মুখরিত ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক পরিম-ল। বরেণ্য এই সংগীতজ্ঞ ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়কাল থেকে তিনি প্রতি বছর ভাষা আন্দোলনের বিশেষ দিন হিসেবে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করে একটি করে নতুন গান করে আসছেন। এ ছাড়া ষাটের দশকে রবি ঠাকুর রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা গানটিকে তিনি মাঠে-ময়দানে গেয়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। ১৯৩৮ সালের ২৯ জুন অধুনা বাংলাদেশের রংপুরের (এখন কুড়িগ্রাম) উলিপুরে জন্মগ্রহণ করেন অজিত রায়। বাবা মুকুন্দ রায় ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, মা জলপাইগুড়ি জমিদার পরিবারের মেয়ে কনিকা রায় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও স্কুল শিক্ষয়িত্রী। খুব ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছে গানে তালিম নেন তিনি। ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে রংপুর কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন তিনি। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ষাটের দশকে অজিত রায় চলে আসেন ঢাকায়। কৈশোরেই তবলা বাজানো শিক্ষা গ্রহণ করেন অজিত রায়। তার গান শেখার প্রেরণা ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। এরপর ১৯৬৩ সাল থেকে রেডিওতে গান গাইতে শুরু করেন। পরে টেলিভিশন প্রচলনের পর থেকে সেখানেও গান গেয়েছেন অজিত রায়, যার বেশিরভাগই রবীন্দ্রসংগীত। সহকর্মী শিল্পীদের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের জুন মাসে তিনি কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। এ সময় তার সতীর্থ হিসেবে ছিলেন আপেল মাহমুদ, আবদুল জব্বার, সমর দাস, কাদেরী কিবরিয়া, সুজেয় শ্যামসহ অন্য শিল্পীরা। তাদের আমরা সম্মানার্থে বলি শব্দসৈনিক। তারা হয়তো অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু যারা অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ছিলেন তাদের প্রেরণার বাণী তো তারাই শুনিয়েছিলেন। তারাও তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান যোদ্ধাই। এ সময়ে তার রচিত ও সুরারোপিত বিখ্যাত গানগুলো রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীসহ সাধারণ মানুষদের স্বদেশকে ঘিরে চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করেছিল। পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, দেশাত্মবোধক গান, গণসংগীতও পরিবেশন করেছিলেন তিনি। তবে তার সবচেয়ে বেশি মুখে মুখে ফেরা গান এটিই, স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা, আজ রুখবে তাদের কারা আজ রুখবে তাদের কারা!