নিপা ভাইরাস

নিপা ভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাস যা পশু থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার নিপাহ নামক গ্রামে প্রথম এই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়, যার পরেই এটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্যারামিক্সোভিরিডি (চধৎধসুীড়ারৎরফধব) পরিবারভুক্ত এই ভাইরাসটি প্রাণীর পাশাপাশি মানুষের মধ্যেও মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

সংক্রমণের উৎস এবং বিস্তার          

নিপা ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসেবে ধরা হয় বাদুড়কে, বিশেষ করে ফলখেকো বাদুড়কে (যাদের ফ্রুট ব্যাট বা সেপ্টরোপাস বলা হয়)। এই বাদুড়গুলো থেকে নির্গত লালা, মূত্র বা মলের মাধ্যমে ভাইরাসটি সংক্রামিত হয়। এই বাদুড়গুলো ফল খাওয়ার সময় বা তাদের নির্গত তরলজাত দ্রব্যের সঙ্গে সংস্পর্শে আসা মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়াও সংক্রামিত শূকর, ঘোড়া বা অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণীর সংস্পর্শেও মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। সংক্রামিত ব্যক্তিদের মধ্যেও নিপা ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়ায়, বিশেষ করে শরীরের তরল বিনিময়ের মাধ্যমে।

উপসর্গ

নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষের মধ্যে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, গলা ব্যথা এবং ক্লান্তি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ ফ্লুয়ের মতো উপসর্গগুলো দেখা গেলেও রোগটি দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হতে থাকে। এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ নিপা ভাইরাসের একটি সাধারণ এবং মারাত্মক উপসর্গ। রোগের এই পর্যায়ে প্রবেশ করলে খিঁচুনি, মানসিক বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে পড়া এবং অবশেষে কোমায় যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। নিপা ভাইরাসের মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি এবং আক্রান্তদের ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন।

প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা

বর্তমানে নিপা ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট টিকা বা চিকিৎসা নেই। সংক্রমণ প্রতিরোধই মূল প্রতিকার ব্যবস্থা। আক্রান্তদের যত দ্রুত সম্ভব পৃথককরণ এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখার মাধ্যমে সংক্রমণ রোধ করা যায়। সেই সঙ্গে জনসাধারণকে ফল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধোয়া, বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং পশুদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরিধান এবং আক্রান্তদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। গবেষণায় নিপা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিভাইরাল ও ইমিউনোথেরাপি নিয়ে কাজ চলছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত চিকিৎসা বা প্রতিরোধক টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব

নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দেখা যায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ভারতসহ বেশ কিছু দেশে। বাংলাদেশে প্রতি বছর শীতকালে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যায়। এর প্রধান কারণ বাদুড় থেকে সংগৃহীত খেজুরের রসের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। তাই শীতকালে খেজুরের রস কাঁচা অবস্থায় পান না করার জন্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন।