ডা. এস এম জহিরুল হক চৌধুরী
অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা।
মাইল্ড স্ট্রোক মস্তিষ্কজনিত রোগ। একে মিনি স্ট্রোকও বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্ত প্রবাহে জমাট বেঁধে এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করে যার ফলে রক্তপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে। চিকিৎসাশাস্ত্রে একে স্কিমিক অ্যাটাক বা টিআইএ বলে। অতিরিক্ত গরমে বা যে কোনো কারণেও যদি হঠাৎ মস্তিষ্ক সামান্য পরিমাণে রক্ত ব্যবহার করে থাকে, আবার কিন্তু মস্তিষ্কের কোষসমূহ অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় অক্সিজেন ও শর্করা সরবরাহে সমস্যা হলেই কিছুক্ষণের মধ্যেই এই কোষগুলো মরতে শুরু করে। মস্তিষ্কের ওই কোষগুলো শরীরের যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করত ওই অংশ প্যারালাইজড হয়েও যেতে পারে।
কীভাবে হয়
মাইল্ড স্ট্রোক করলে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, অবশ্য পরে আবার চালু হয়। দুই ধরনের মাইল্ড স্ট্রোক হতে পারে, যেমন: হেমোরেজিক স্ট্রোক ও স্কিমিক স্ট্রোক। হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে, তবে স্কিমিক স্ট্রোকে রক্তক্ষরণ হয় না।
স্ট্রোকের লক্ষণ
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা আঞ্চলিকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া দুই অবস্থাতেই প্রায় একই ধরনের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায়। স্ট্রোক হলে সাধারণত যেসব লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ দেখা যায় সেগুলো হলো মাথা ঝিমঝিম করা, প্রচ- মাথাব্যথার সঙ্গে ঘাড়, মুখ এবং দুই চোখের মাঝখান পর্যন্ত ব্যথা হওয়া, হাঁটতে কিংবা চলাফেরা করতে এবং শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হওয়া, কথাবার্তা জড়িয়ে যাওয়া এবং অস্পষ্ট শোনানো, শরীরের একপাশে দুর্বল, অসাড় কিংবা প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া, চোখে অস্পষ্ট দেখা, অন্ধকার দেখা কিংবা ডাবল দেখা, বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়া ইত্যাদি।
স্ট্রোক বুঝার উপায়
শরীরের কোনো একদিকে দুর্বলতাবোধ করা বা নাড়াতে না পারা, হাত-পায়ে অবশ ভাব, মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, প্রচ- মাথাব্যথা হওয়া, কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া, বমি হওয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, মুখের অসাড়তা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, বেসামাল হাঁটাচলা, হঠাৎ খিঁচুনি বা ধপ করে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলে বুঝতে হবে স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন হলে রোগীকে কাত করে শুইয়ে দিতে হবে। এ অবস্থায় কোনো খাবার বা ওষুধ মুখে দেওয়া যাবে না। কারণ এগুলো শ্বাসনালিতে ঢুকে আরও ক্ষতি করতে পারে। বরং মুখে জমে থাকা লালা, বমি পরিষ্কার করে দিতে হবে। টাইট জামা-কাপড় ঢিলা করে দিতে হবে। হাসপাতালে যাওয়ার সময় রোগীর আগের চিকিৎসার ফাইল নিতে হবে।
স্ট্রোকের পর করণীয়
অতি দ্রুত কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ইমার্জেন্সি ব্রেইনের রেডিওলজিক টেস্ট, সিটিস্ক্যান, এমআরআই করা উচিত। ঘাড়ের রক্তনালির ডপলার, হার্টের সমস্যার জন্য ইকো পরীক্ষা করা উচিত। রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা পরীক্ষা করে নিতে হবে। প্রয়োজনে এনজিওগ্রাম ও ইকোকার্ডিওগ্রাফি পরীক্ষাও করতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসা
স্ট্রোক ব্রেইনের রক্ত চলাচল কমে যাওয়ার জন্য হয় এবং ব্রেইন কম রক্তপ্রবাহ নিয়ে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না, সেহেতু স্ট্রোকের চিকিৎসা তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করতে ওষুধ প্রয়োগ করে রক্তের চাপ, রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে। রক্তের জমাটবাঁধা অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে। প্রাথমিক ধাপ কাটিয়ে ওঠার পর বহুদিন পর্যন্ত ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। স্ট্রোক হয়েছে বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কাদের স্ট্রোক হতে পারে
স্ট্রোক সাধারণত ৫৫ বছরের বেশি বয়স্ক পুরুষদের বেশি হয়। এছাড়াও যাদের স্ট্রোক হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, অতিরিক্ত মোটা বা স্থূলতা ইত্যাদি রোগ
থাকলে। পারিবারিকভাবে অর্থাৎ পরিবারে কারও স্ট্রোক কিংবা হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ইতিহাস থাকলে। হৃৎপি-ের অসুখ যেমন নাড়ির অস্বাভাবিক স্পন্দন, হৃৎপি-ের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, হৃৎপি-ের ত্রুটি বা হৃৎপি-ের সংক্রমণ ইত্যাদি রোগ থাকলে। কোনো হরমোন থেরাপি বা জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ সেবনের ফলে। পূর্বে এক বা একাধিকবার স্ট্রোক হয়ে থাকলে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়
স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো স্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি মেনে চলা। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি হলো : নিয়মিত ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না এবং কোলস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সঠিক নিয়মে সময়মতো এবং সঠিক পরিমাণে খাবার খেতে হবে। নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ধূমপান বাদ দিতে হবে। প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম অথবা সময় করে হাঁটা বা হালকা দৌড়াতে হবে। শরীর যেন মুটিয়ে না যায় অর্থাৎ দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি মাছ, দুধ, ভুসিসমৃদ্ধ খাবার ইত্যাদি রাখতে হবে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা যাবে না।
দ্রত চিকিৎসা
স্ট্রোক হলে আক্রান্ত এলাকার মস্তিষ্ক কোষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। রক্ত সরবরাহ ২ থেকে ৫ মিনিটের বেশি বন্ধ থাকলে স্নায়ুকোষ স্থায়ীভাবে ধ্বংস হয়।