বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে সারা দেশে পালিত হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।

গতকাল দিনের শুরুতে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শহীদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। একে একে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দলসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। তা ছাড়া সামাজিক সংগঠন আমরা একাত্তর, ডিসেম্বর ১৯৭১ উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ছায়ানট ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সাধারণ মানুষের ঢল নামে।

স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এই দেশীয় দোসররা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশের সূর্যসন্তান শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিন্তক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ক্রীড়াবিদ, সরকারি কর্মকর্তাসহ দেশের বহু কৃতী সন্তানকে হত্যা করা হয়।

বিদেশে বাংলাদেশের হাইকমিশন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ছাত্র সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া আলোচনা সভা, মৌন মিছিল ও বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভা করা হয়। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। সভার শুরুতে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এতে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সাজেদা বানু। তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. গিয়াসউদ্দিন আহমেদের বোন।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পক্ষ থেকে গতকাল সকালে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এ সময় ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান ও প্রফেসর ড. মো. সাইদুর রহমান, ইউজিসি সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলাম, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়া, ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন বিভাগের পরিচালক জেসমিন পারভীনসহ অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে সকাল ৮টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং সকাল ১০টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এ সময় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, রেজিস্ট্রার, ডিন, পরিচালক, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাজীপুর ক্যাম্পাসে ভোরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ এবং দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবনগুলোয় বিভিন্ন ব্যানার প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া জোহরের নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশে বাউবির আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের কর্মসূচি পালন করা হয়।

এদিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআনখানি ও আলোচনা সভা এবং বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা শেষে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মুফতি মাওলানা মো. মিজানুর রহমান। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হয়।

দিবসটি উপলক্ষে দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা বাণী দিয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা বিবৃতি দেন।

দিবসটি উপলক্ষে সংবাদপত্রে বিশেষ নিবন্ধ ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা হচ্ছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে।

এদিকে দেশের বাইরে ইসলামাবাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনে যথাযথ মর্যাদায় ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বাণী পাঠ, আলোচনা সভা ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ হাইকমিশনের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এতে অংশ নেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হাইকমিশনার ইকবাল হোসেন খান ও উপহাইকমিশনার মো. আমিনুল ইসলাম খান।

চট্টগ্রামে শ্রদ্ধায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ : নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গতকাল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগের আদর্শ বুকে ধারণ করে সমাজে ন্যায়, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয় এসব কর্মসূচিতে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আমাদের দেশের যেসব সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানদের অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যারা ছিলেন দেশের মেরুদ-। আমরা আজকের দিনে তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে এবং শহীদ পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অবশ্যই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা তাদের নাম ও ইতিহাস সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আলোচনা সভার আয়োজন করে। জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. রইছ উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) রওশন আরা।