স্বদেশের প্রতি প্রেম-ভালোবাসা ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজের মাতৃভূমি মক্কাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। এমনকি কাফেরদের কঠিন ষড়যন্ত্রের কারণে এবং মহান আল্লাহর নির্দেশে মদিনায় হিজরত করলেও জন্মভূমি মক্কার প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসা ছিল। তাই তো তিনি হিজরতকালে বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকিয়ে কোমল কণ্ঠে বলছিলেন, ‘হে আমার দেশ, তুমি কত সুন্দর! আমি তোমাকে কতই না ভালোবাসি। তোমার অধিবাসীরা যদি ষড়যন্ত্র না করত, আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’
রাসুল (সা.) মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের পর মদিনা সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন তা কল্যাণরাষ্ট্রের অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বিশ্ব ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান এবং শান্তি-সম্প্রীতির ঐতিহাসিক দলিল মদিনা সনদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাসহ সব ধর্ম-বর্ণের নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ধারা সন্নিবেশিত রয়েছে। সেখানে উল্লিখিত আছে, ‘সনদে স্বাক্ষরকারী সব গোত্র-সম্প্রদায় মদিনা রাষ্ট্রে সমান অধিকার ভোগ করবে, সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের স্ব স্ব ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার যথারীতি বহাল থাকবে। কেউ কারও ওপর কোনোরূপ আক্রমণ করবে না, সন্ধিভুক্ত কোনো সম্প্রদায় বাইরের শত্রু কর্র্তৃক আক্রান্ত হলে উক্ত আক্রান্ত সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করতে হবে এবং শত্রুদের প্রতিহত করতে হবে। কোনো নাগরিক কোনো অপরাধ করলে তা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য করা হবে।’ (সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ ২/৯৪) এভাবে ঐতিহাসিক মদিনা সনদের মাধ্যমে শান্তির বার্তাবাহক বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, সাম্য-মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন রচনা করে আদর্শ কল্যাণরাষ্ট্রের অদ্বিতীয় নজির স্থাপন করেন। তিনি নিজ হাতে গড়া রাষ্ট্র মদিনাকে স্বদেশ হিসেবে অকৃত্রিম ভালোবাসতেন।
রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমাশীলতা ও উদারতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তাও নিজ মাতৃভূমি ও তার নাগরিকদের প্রতি ভালোবাসা ও পবিত্রতামুখর বিজয় উদযাপনের অপূর্ব নমুনা হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। মক্কার কাফেরদের অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নে প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করলেও পরে মহান আল্লাহর অপার মেহেরবানীতে তিনি বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের পর রহমতের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেছিলেন, হে মক্কাবাসী! আজ আমি তোমাদের উদ্দেশে সে কথাই বলছি, যে কথা হজরত ইউসুফ (আ.) নিজ ভাইদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’ (সুরা ইউসুফ ৯২)
ইসলামের এই সুমহান শিক্ষা ও মানবতার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চিরন্তন আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়া এবং স্বদেশের সামগ্রিক কল্যাণে আত্মনিবেদন করা সুনাগরিকের কর্তব্য।