ট্রাস্ট্রি বোর্ডের দ্বন্দ্বের জেরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুর ও মারধর

সাভারে অতর্কিত হামলা-ভাঙচুর ও মারধর করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করেছে একটি চক্র। খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডা. নাজিম উদ্দিন ও তার সহযোগীরা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দখলের চেষ্টা চালালে হাসপাতালের কর্মী, চিকিৎসক এবং রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ ও  গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে একদল সন্ত্রাসী প্রথমে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পিএইচএ ভবনের প্রধান গেটে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থারত ছাত্রদেরকে বের হয়ে যেতে বলে। এরপর তারা সেখানকার বিভিন্ন কক্ষে হামলা চালিয়ে তালা লাগিয়ে দেয়। সেখানে কর্মরত পরিচ্ছন্ন কর্মী আয়না ও শিরিনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয়। পরে তারা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মূল ভবনের দিকে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালটির একজন কর্মকর্তা বলেন, পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে ডা. নাজিমের নেতৃত্বে আরেকটি গ্রুপ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে। সামনের এবং পিছনের দুদিক দিয়ে ঢুকে দুটি গ্রুপ একত্রিত হয়ে পুরো হাসপাতাল ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা প্রতিটি গেটে তালা লাগিয়ে দেয়। সন্ত্রাসীরা হাসপাতালের ইর্ন্টানি চিকিৎসক আব্দুল হান্নান ও হিসাবরক্ষক শুভ বসাককে বেধড়ক পিটিয়ে গুরতর  আহত করে। পরে তারা গণমুদ্রণ অফিসে ঢুকে কর্মকর্তা ইমতিয়াজকে মারধর করে। এরপর ডা. নাজিম তার লোকজন নিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিনুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তালা ভেঙ্গে লোকজন নিয়ে ভেতরে বসে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডেকে নিয়ে এখন থেকে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সকল দায়িত্ব পালন করার ঘোষণা দেন। আগের পরিচালক ডা. আমিনুল ইসলামকে বাদ দিয়ে ডা. উজ্জল হাসানকে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেন। এভাবে ঘণ্টাখানিক সেখানে অবস্থান করেন ডা. নাজিম উদ্দিন ও তার লোকজন ।

এ দিকে ডা. নাজিম উদ্দিন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে এ রকম খবর ট্রাস্ট্রি বোর্ডের অন্যান্য সদস্যদের কাছে পৌঁছে গেলে তারা বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মতকর্তাদেরকে অবহিত করেন। পরে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক ও ওসি তদন্ত কামাল হোসেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলা ও মারধরের অভিযোগে ৫ জনকে আটক করে। অবস্থা বেগতিক দেখে  ডা. নাজিম ও তার লোকজন নিয়ে দ্রুত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ত্যাগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. নাজিম উদ্দিন ২০২৩ সালের জুন মাসে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর তার পছন্দ মতো  ১০৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধভাবে নিয়োগ দেন। যারা গত ১ বছর তার ব্যক্তিগত বাহিনী হিসেবে কাজ করে আসছিল। এ ছাড়াও  ট্রাস্ট্রি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে হিসাব খুলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। নানা অনিয়ম দুর্নীতি আর স্বজন প্রীতি করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে নিজের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলে। কিন্তু এ বছর ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর গত ২৪ আগস্ট ডা. নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন না বলে অঙ্গিকার দিয়েও আবার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখল করতে আসা খুবই দুঃখজনক বলে জানিয়ে হাসপাতালটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, ডা. নাজিম উদ্দিন সকালে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এসে আমাদের ওপর হামলা চালিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালায়। বাঁধা দিতে গেলে আমাদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করায় চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনায় আমাদের রোগী ও চিকিৎসকরা ভীতসন্ত্রস্ত। বর্তমানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পুলিশের পাহারায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও হাসপাতালের কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা।

তবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলের চেষ্টা বিষয়ে অভিযুক্ত ডা. নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ জানান, আমি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্ট্রি। আমি কেন আমার প্রতিষ্ঠান দখল করতে যাব। আমি সকালে আমার লোকজন নিয়ে মিটিং করতে গিয়েছিলাম বরং তারাই আমাদেরকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করছে । 

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ট্রাস্ট্রি বোর্ডের দুপক্ষের মধ্যে দ্বন্ধের জের ধরে দখল পাল্টা দখলের অভিযোগ রয়েছে। তবে পুলিশ উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। কোনো ট্রাস্ট্রি বৈধ আর কোন ট্রাস্ট্রি অবৈধ তা আইনের মাধ্যমে সমাধান করতে বলা হয়েছে। এক পক্ষের হামলার অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং ৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরবর্তীতে হামলায় সম্পৃক্ততা না থাকায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। বর্তমানে পুলিশ পাহারায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।