সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধান বাতিল করে গত মঙ্গলবার রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার পথ সুগম হয়েছে। তবে আদালতের এখনো ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন আছে। সেগুলো নিষ্পত্তি হলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পথ উন্মুক্ত হবে। তবে আইনজীবী ও বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের রায় এবং সরকারি অধ্যাদেশের পরও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংসদের অনুমোদন লাগবে।
দেশের রাজনীতিতে গত তিন দশকের বেশি সময়ের আলোচিত বিষয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্দলীয় এ সরকারব্যবস্থা বিলোপ করে আনা পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল করে গত মঙ্গলবার রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। পাশাপাশি এ দুটি ধারাসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪(২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেছে আদালত। হাইকোর্টের এ রায়ে গণভোটের বিধান পুনরুজ্জীবিত করতে বলা হয়েছে। তবে আদালত পঞ্চদশ সংশোধনী পুরো বিষয় বাতিল করেনি। ওই সংশোধনীর ৫৪টি বিষয়ের মধ্যে ৬টি বাদে বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে পরবর্তী জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছে হাইকোর্ট। এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেটি কীভাবে ফিরবে? গত মঙ্গলবার রায়ের পর সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেছিলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মামলার মাধ্যমে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। যার ভিত্তিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের বিরুদ্ধে একাধিক রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন আপিল বিভাগে বিচারাধীন আছে। এখন ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলা নিয়ে করা রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদনটি আগে নিষ্পত্তি হতে হবে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফেরার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপিল বিভাগে এখনো রিভিউ পিটিশন (ত্রয়োদশ সংশোধনী) বিচারাধীন এবং এ বিষয়ে সমাধানের জন্য অতি অবশ্যই রিভিউ পিটিশনটি নিষ্পত্তি হতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের পর এটি (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আপাতদৃষ্টিতে জাতীয় সংসদই করবে এবং সংসদেরই এটা করা উচিত। তবে আপিল বিভাগের রায়ে এ বিষয়ে করণীয় আদেশ থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারও এটি করতে পারবে। কেননা এ সরকার প্রথম যেদিন দায়িত্ব নিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিয়েই দায়িত্ব পালন করছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ল ডিক্লেয়ার করেছে সুপ্রিম কোর্ট। সুতরাং এটি করার দায়িত্ব হচ্ছে, যে সরকার দায়িত্বে থাকবে তারা করতে পারবে। অর্থাৎ বর্তমান সরকারও সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে কোনো বাধা হবে না।’
হাইকোর্টে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলায় অন্যতম রিটকারী ছিলেন সুশাসনের নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি মনে করেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী রিভিউ আবেদন এবং হাইকোর্টের এ রায় দুটোই আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরুজ্জীবিত করতে সংসদের অনুমোদন নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতে পরবর্তী জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে আরও একটি সংশোধনীর প্রয়োজন হতে পারে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি (হাইকোর্টের রায়) এখন আপিল বিভাগে যেতে হবে। আপিল বিভাগের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলে বিষয়টি জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপিত হতে হবে এবং এরপরই এটি আমাদের সাংবিধানিক আইনের অংশ হবে।’ বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের একটা রেফারেন্সের ভিত্তিতে। এটা একটা ভিন্ন সরকার। তাই প্রচলিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির সঙ্গে এটা মেলানো ঠিক হবে না। বর্তমান সরকার নির্বাচনের আয়োজন করবে। তবে তত্ত্বাবধায়ক ফিরিয়ে আনতে সংসদের অনুমোদন লাগবে। এটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে আরও সময় লাগবে।’
পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রুলে ইন্টারভেনারদের (আদালতকে সহায়তাকারী) পক্ষের অন্যতম আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপিল বিভাগে যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর যে মামলাটি (রিভিউ) বিচারাধীন আছে সেটি নিষ্পত্তি হতে হবে আগে। নিষ্পত্তির পর একটি সংশোধনী আইন প্রয়োজন হবে। এই সংশোধনী আইন করার জন্য সরকারি সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে। অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিন্তু সংবিধানের সংশোধন করা যায় না। বর্তমান সরকার সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না। সেজন্য আপিল বিভাগে রিভিউ মামলাটি নিষ্পত্তির পর ওই রায়ের আলোকে কী নির্দেশনা থাকে, সেভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।’