রক্তাক্ত ইজতেমা ময়দানে ৪ লাশ

দীর্ঘদিনের মত-পথের দ্বন্দ্ব পেল রক্তাক্ত পরিণতি। তাবলিগ জামায়াতের সাদ ও জুবায়েরপন্থিদের মধ্যে ইজতেমা প্রাঙ্গণের দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ঝরেছে চারজনের প্রাণ। এই সংঘাতে আহত হয়েছে আরও দুশোর বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে গুরুতর আহত ছয়জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। এ ছাড়া টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৯ জন। সংঘর্ষের পর ইজতেমা ময়দান ছেড়েছেন সাদপন্থিরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ইজতেমা প্রাঙ্গণসংলগ্ন উত্তরা ও টঙ্গীর বেশ কিছু এলাকায় সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)। এই সংঘাতের ঘটনাকে ইসলামের জন্য ক্ষতিকর ও দুঃখজনক বলছেন দেশের ইসলামি প-িতরা। সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে ডিএমপি ও জিএমপি। তবে এ ঘটনায় মামলা করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। ঘটনার পর গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষ জুবায়েরপন্থি ও সাদপন্থিদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় চারজন নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। মামলার পর জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা চারজন নিহতের কথা বললেও নিহত তিনজনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানার এগারসিন্দু গ্রামের আমিনুল ইসলাম বাচ্চু (৭০), ঢাকার দক্ষিণখানের বেড়াইদ এলাকার মো. আব্দুস সামাদের ছেলে বেলাল হোসেন (৬০) ও বগুড়ার তাইজুল ইসলাম (৬৫)। তারা সবাই মাওলানা জুবায়েরের অনুসারী বলে জানিয়েছেন তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ (শূরায়ি নেজাম)-এর মাওলানা জুবায়ের অনুসারীদের মিডিয়া সমন্বয়কারী হাবিবুল্লাহ রায়হান। তবে মাওলানা সাদ অনুসারীদের মিডিয়া সমন্বয়কারী মো. সায়েম দাবি করেছেন, নিহত বেলাল হোসেন মাওলানা সাদ সমর্থক। বেলালের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জুবায়েরপন্থি অংশের গণমাধ্যম সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান। আর মাওলানা সাদপন্থি অংশের গণমাধ্যম সমন্বয়ক মো. সায়েম নিশ্চিত করেছেন তাইজুল ইসলামের মৃত্যুর বিষয়টি।

সংঘর্ষ ও প্রাণহানির এই ঘটনায় উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তাবলিগ জামাতের দুপক্ষকেই শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে : বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল মাওলানা জুবায়ের অনুসারীরা। ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমা শুরু হওয়ার কথা। এ পর্বে মাওলানা জুবায়ের অনুসারীরা ইজতেমার আয়োজন করবেন। অন্যদিকে ২০ ডিসেম্বর থেকে ৫ দিনের জোড় ইজতেমা করার জন্য সাদ অনুসারীরা ইজতেমা ময়দানে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন কয়েক দিন আগে থেকেই। সাদ অনুসারীরা যেন ইজতেমা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন জুবায়ের অনুসারীরা। ইজতেমা প্রাঙ্গণে তুরাগ নদের পশ্চিম পাড়ে অবস্থান করছিলেন সাদ অনুসারীরা। মঙ্গলবার মধ্যরাতে (আড়াইটা) মাওলানা সাদ অনুসারীরা কামারপাড়া ব্রিজ পার হয়ে ইজতেমা প্রাঙ্গণের বিদেশি নিবাসের গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। ইজতেমা প্রাঙ্গণের ফটকে পাহারায় থাকা জুবায়ের অনুসারীদের মারধর করে ভেতরে ঢুকে সাদপন্থিরা। ঘুমন্ত জুবায়েরপন্থিদের ওপর হামলা চালান সাদ অনুসারীরা। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই শতাধিক লোক আহত হয়। তাদের উদ্ধার করে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লা মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢামেক হাসপাতালে আহত অবস্থায় ভর্তি হয়েছিলেন ৩৬ জন। তাদের মধ্যে ছয়জনের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। দুজন অন্য দুটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। গতকাল সকালে ঢামেকের ভেতরেও সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন সাদ ও জুবায়েরপন্থিরা। এজন্য হাসপাতালে অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

এ বিষয়ে ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘টঙ্গীর ইজতেমার ময়দানে সংঘর্ষের ঘটনায় একজনের মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছাড়া এ ঘটনায় আহত ৩৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। আটজনকে ভর্তি করা হয়েছে। যারা ভর্তি রয়েছেন তাদের অবস্থা গুরুতর। যাদের অস্ত্রোপচার লাগবে, তাদের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।’

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ঢামেকে চিকিৎসাধীন আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ হইচই শুনে ঘুম ভাঙে। তখন দেখেন তার সাথীদের মারধর করা হচ্ছে। বাধা দিতে গেলে সাদপন্থিরা তাকেও পিটিয়ে আহত করেন। সাদপন্থি অনেকের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল। এ ছাড়া সবার হাতেই বাঁশ, লাঠিসোঁটা ছিল। হুট করে তাদের ওপর হামলা করায় তারা বেশি হতাহত হয়েছেন।

এই সংঘর্ষে হাসপাতালে ভর্তি আছেন বরগুনার বামনার ফয়সাল (১৮)। সাভারের মারকাজুল উলুম মাদ্রাসার কিতাব বিভাগের সাদপন্থি এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘জোড় ইজতেমা করার জন্য আমরা মঙ্গলবার রাতে টঙ্গী যাই। ইজতেমা মাঠে ঢুকতে গেলে জুবায়েরপন্থিরা আমাদের ওপর চড়াও হন। তখন সংঘর্ষ বাধে। জুবায়েরপন্থিদের একজন আমার বুকের বাঁপাশে ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। এরপর আমাকে পেটাতে থাকেন। আহত অবস্থায় অন্য সাথীরা সেখান থেকে বের করে ঢামেকে নিয়ে আসেন।’

টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লা মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের রেজিস্ট্রারের তথ্য অনুযায়ী, ইজতেমা ময়দানের সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ৩৯ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা সিনিয়র নার্স হাফিজুর রহমান বলেন, ভোর সাড়ে ৪টা থেকে আহতরা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসতে থাকেন।

ইজতেমা প্রাঙ্গণ ছেড়েছেন সাদপন্থিরা : সংঘর্ষের ঘটনায় মাওলানা সাদপন্থিদের সঙ্গে সরকারের ৫ উপদেষ্টা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভা হয়। এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সাদপন্থিরা ইজতেমা মাঠ ছেড়ে চলে যাবেন। এরপর বেলা ৩টা থেকে সাদ অনুসারীরা ইজতেমা প্রাঙ্গণ ছাড়তে শুরু করেন। বিকেল ৫টা নাগাদ সাদ অনুসারীদের প্রায় সবাই ইজতেমা প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যান। তারা ফিরে যাওয়ার পথে যেন কোনো বাধার সম্মুখীন না হন, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।

দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর ইজতেমা নিয়ে কঠোর অবস্থানে তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বিরা। দেশে একটাই ইজতেমা হবে, এমনটি উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বি মুফতি আমানুল হক। গতকাল রাজধানীর কাকরাইলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) সন্ধ্যার মধ্যে যদি সাদিয়ানি বাহিনী (সাদপন্থিরা) মাঠ ছেড়ে না দেয়, তাহলে আগামীকাল (আজ) সারা বাংলাদেশ ও ঢাকার ৮ পয়েন্ট থেকে আমরা লং মার্চ করে টঙ্গীর মাঠে গিয়ে সমবেত হয়ে জোহরের নামাজ আদায় করব। তারা যদি মাঠ ছেড়েও দেয়, আমরা লং মার্চ না করলেও তাদের নামে হত্যা মামলা করব। আমরা তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।’

জুবায়ের অনুসারীদের মহাসড়ক অবরোধ : ইজতেমা ময়দানের দখল নিয়ে সংঘর্ষের জন্য দায়ীদের বিচার ও ময়দান জুবায়েরপন্থিদের বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন জুবায়ের অনুসারীরা। গতকাল সকাল ১০টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুরের মুলাইদে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় সড়কটি এক ঘণ্টারও বেশি সময় অবরোধ করে রাখেন তারা। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এ ছাড়া একই দাবিতে নগরীর বোর্ডবাজার ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় বিক্ষোভ করের জুবায়ের অনুসারীরা।

ইজতেমা মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা : ইজতেমা মাঠে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। গতকাল গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ড. নাজমুল করিম খান স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

তাবলিগ জামাতের সমাগম ঘিরে প্রাণহানির ঘটনাকে অপ্রত্যাশিত ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক (হালাল সনদ বিভাগ) ড. মাও. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইসলামের দাওয়াত দেওয়া নিয়ে কেন মারামারি পর্যন্ত যাবে? কেনইবা মাঠ দখল নিয়ে এমন একটি ঘটনা ঘটবে। সবার অংশগ্রহণে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, এখানে সংঘর্ষ কেন হবে? এটি দুঃখজনক, বেদনাদায়ক। সরকার যেভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সেটা মেনে ইজতেমা শেষ করা উচিত। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা যাতে সৃষ্টি না হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে। এমন সংঘর্ষের ধারায় ইসলামের ক্ষতি হচ্ছে।’

জামায়াতের উদ্বেগ ও শোক : তাবলিগ জামাতের ইজতেমাকে কেন্দ্র সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দাওয়াতি দ্বীনের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন তাবলিগ জামাত দীর্ঘদিন ধরে সারা বিশে^ মুসলিম-অমুসলিমদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আসছে। ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের অনেক অবদান রয়েছে।’

জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা, দেশ ও উম্মাহর স্বার্থে সবাই অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসবেন। আমরা সবাইকে শান্ত থাকার জন্য আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাই।’