এ বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত পাঁচজনই মারা গেছেন। ২০২৪ সালে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শতভাগ। এর আগে ২০২৩ সালে নিপাহ ভাইরাসে ১৩ জন আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১০ জন। সে বছর মৃত্যুহার ছিল ৭৭ শতাংশ। এ নিয়ে ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে রোগটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৪৩ জন ও তাদের মধ্যে ২৪৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ মৃত্যুহার ৭১ শতাংশ।
আজ বৃ্হস্পতিবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এই তথ্য জানায়। প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি’ শীর্ষক এক মতবিনিময়সভায় রোগটির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন।
ডা. তাহমিনা শিরিন জানান, এ বছর আক্রান্ত পাঁচজনের মধ্যে চারজন পুরুষ, একজন নারী। এদের মধ্যে দুইজন শিশুও ছিল। মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুইজন মানিকগঞ্জের। অন্যরা খুলনা, শরীয়তপুর ও নওগাঁর বাসিন্দা।
আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, নিপাহ্ একটি প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস। এ ভাইরাসের বাহক টেরোপাস (ফল আহারি) গোত্রীয় বাদুড়। বাদুড় থেকে মানুষে এই রোগের সংক্রমণ হয়। মানুষের মধ্যে এ সংক্রমণ প্রথম সনাক্ত হয় মালয়েশিয়ায় ১৯৯৮ সালে। বাংলাদেশে ২০০১ সালে মেহেরপুর জেলায় নিপাহ ভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব চিহ্নিত হয়। এরপর থেকে প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ৭১%-এর অধিক।
বাংলাদেশে নিপাহ্ ভাইরাসের বিস্তার এবং ঝুঁকি নিরূপণের জন্য আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআর,বি ২০০৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে ১২টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক্টিভ সাভের্ইলেন্স ও ২টি সরকারি সদর হাসপাতালে পেসিভ সাভের্ইলেন্স কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ ছাড়া প্রতিবছর ৫০০-র অধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে এনহান্স নিপাহ সার্ভিলেন্স পরিচালনা করা হয়। ইউএস-সিডিসি ও সিইপিআই এতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে।
এই বিশেষজ্ঞ জানান, বাংলাদেশের বাইরে সাম্প্রতি ভারতের কেরালাতে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। ২০২৪ সালে কেরালাতে ২ জন আক্রান্ত হয় এবং ২ জনই মারা যান। ভারতে ২০০১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭৪ জন মারা গেছেন। রোগী অনুপাতে মৃত্যুহার প্রায় ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশে শীত মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কিন্তু ভারতের কেরালাতে গ্রীষ্মকালে নিপাহ্ ভাইরাসের সংক্রমন দেখা যায়।
ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, সাধারণত খেজুরের কাঁচা রস পানের মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। বাদুড়ের মুখের লালা বা মল-মূত্র দ্বারা খেজুরের রস বা তালের রস-এ নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। এই রোগের প্রধান লক্ষণ হলো- জ্বরসহ মাথাব্যাথা, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন (আবোল-তাবোল বলা/ভুল বলা), কোনও কোনও ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট।
এই পরিচালক আরও জানান, বাংলাদেশে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর নজির রয়েছে, যার পরিসংখ্যন শতকরা ২৮ ভাগ। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো মৃত ব্যক্তির শরীরের নমুনা হতে নিপাহ ভাইরাস সনাক্ত করা হয়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে মায়ের বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, টেলিফোন সার্ভের মাধ্যমে ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাংলাদেশে খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে দেখা যায় রোগীদের মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫৭ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে ৫১ শতাংশ ও ঢাকা বিভাগে ৩১ শতাংশ রোগীর খেজুরের কাঁচা রস পান করার ইতিহাস পাওয়া গেছে।
আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, স্বাস্থ্যবিধি (মাস্ক ও গ্লাভস পরিধান করা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া) মেনে নিপাহ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে হবে। নিপাহ ভাইরাসের কোনও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা বা প্রতিষেধক নেই। তাই প্রতিরোধই একমাত্র পথ।
সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে আইইডিসিআর জানায়, খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। যে কোনও ফল ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে। গাছের নীচে পড়ে থাকা আধা খাওয়া কিংবা ফাটা ফল খাওয়া যাবে না এবং শিশুদের এ বিষয়ে বিশেষ ভাবে সতর্ক করতে হবে। খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার পর নিপাহ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। নিপাহ আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসলে সাবান ও পানি দিয়ে দুই হাত ধুতে হবে।
আইইডিসিআর সতর্ক করে দিয়ে আরও জানায়, বাংলাদেশে শীতের সময় বিভিন্ন স্থানে রস উৎসব পালন করা হয় এবং অনলাইনের মাধ্যমে খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি করতে দেখা যায়। এর মাধ্যমে সারাদেশ নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে রস উৎসব পালন, খেজুরের কাঁচা রস বিক্রি ও অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর বিক্রির প্রচার বা বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না।