নিপাহ ভাইরাসের মারাত্মক ঝুঁকিতে দেশ

  • ২৩ বছর আগে ছিল ১ জেলায়, এখন ৩৪ জেলায়
  • মোট রোগী ৩৩৯, মৃত্যু ২৪০, মৃত্যুহার ৭১ শতাংশ
  • একের অধিকবার সংক্রমণ ২০ জেলায়
  • সর্বোচ্চ সংক্রমণ ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে
  • বেশি রোগী ও মৃত্যু ২০০৪ সালে
  • ডিসেম্বর থেকে মে পযন্ত ঝুঁকিপূর্ণ
  • খেজুরের কাচা রস না খাওয়ার পরামর্শ   
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:০২ এএম

দেশে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো শুধু মেহেরপুর জেলায় নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। সে বছর আক্রান্ত ১৩ রোগীর মধ্যে ৯ জনই মারা যায়। মৃত্যুহার ছিল ৬৯ শতাংশ। এরপরের বছর দেশের কোথাও রোগটির সংক্রমণ ধরা পড়েনি। কিন্তু তারপর থেকেই ধীরে ধীরে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের নতুন নতুন জেলায়।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ি, গত ২৩ বছরে দেশের ৩৪ জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একের অধিকবার সংক্রমণ দেখা গেছে ২০ জেলায়। বিশেষ করে রাজশাহী ও ফরিদপুর অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বছর যে ১৪ জন রোগী মারা গেছে, তাদের মধ্যে ১০ জনই রাজশাহী অঞ্চলের। বাকি ৪ জন ফরিদপুর অঞ্চলের। 

এ বছরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআরের বিজ্ঞানীরা বলেন, চলতি বছর দেশের ৭ জেলায় ১৪ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো নরসিংদী জেলায় সংক্রমণ ঘটেছে। এটি নতুন করে শঙ্কার কারণ। এতদিন শুধু উত্তরাঞ্চলে ঘটছে ধারণা করা হলেও এখন তা মধ্য অঞ্চলে পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই রোগের মৃত্যুহার অনেক বেশি। দেশে ২০০১ সালে প্রথম নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৩৩৯ জন ও মারা গেছে ২৪০ জন। অর্থাৎ মৃত্যুহার ৭১ শতাংশ। মৃত্যুহার বিবেচনায় যা অত্যন্ত শঙ্কাজনক। সুতরাং কোনোভাবেই এই রোগের প্রধান ও একমাত্র উৎস খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। তবে রস জ্বাল দিয়ে খেলে বা গুড় খেলে কোনো ক্ষতি নেই।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শ. ম. গোলাম কায়ছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিপাহ একটি ভাইরাসজনিত মারাত্বক প্রাণঘাতী রোগ। সাধারণত শীতকালে নিপাহ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কাঁচা খেজুরের রসে বাদুড়ের বিষ্ঠা বা লালা মিশ্রিত হয় এবং ওই বিষ্ঠা বা লালাতে নিপাহ ভাইরাসের জীবাণু থাকে। ফলে খেজুরের কাঁচা রস পান করলে মানুষ নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তাই কোনোভাবেই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। 

একের অধিকবার সংক্রমণ ২০ জেলা: আইইডিসিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংক্রমিত ৩৪ জেলার মধ্যে একের অধিকবার সংক্রমণ দেখা গেছে ২০ জেলায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর সংক্রমণ দেখা গেছে ফরিদপুর জেলায়। এরপর নওগাঁয় ৯ বছর, ৭ বছর করে গোপালগঞ্জ ও নাটোরে, ছয় বছর রাজশাহীতে,  পাঁচ বছর রংপুর, চার বছর করে দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ ও নীলফামারি, তিন বছর কুড়িগ্রাম, মাদারীপুর, মাগুড়া ও পাবনা এবং ২ বছর করে সংক্রমণ দেখা গেছে বগুড়া, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও জেলায়।

১২ জেলায় একবার করে সংক্রমণ ঘটেছে। জেলাগুলো হলো- চাপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, ঢাকা, গাইবান্ধা, খুলনা, শরীয়তপুর  ও টাঙ্গাইল।

সর্বোচ্চ সংক্রমণ ফরিদপুরে: গত ২৩ বছরে দেশের যে ৩৪ জেলায় নিপাহ ভাইরাস দেখা গেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার রোগটি দেখা গেছে এই জেলায় ও রোগীও সর্বোচ্চ ৭১ জন, যা মোট রোগীর ২১ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে রাজবাড়ীতে, ৩১ জন। 

এরপর নওগাঁয় ২৭ জন, লালমনিরহাটে ২৪ জন, মানিকগঞ্জে ১৭ জন, রংপুরে ১৬ জন, মেহেরপুরে ১৩ জন, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, টাঙ্গাইল ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১২ জন করে ও জয়পুরহাটে ১০ জন রোগী পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ৯ জন রোগী পাওয়া গেছে দিনাজপুর, ৮ জন করে গোপালাগঞ্জ ও নাটোরে, ৬ জন করে মাদারীপুর, মাগুড়া ও নীলফামারী, পাবনায় ৪ জন, তিনজন করে বগুড়া ও কুড়িগ্রামে, ২ জন করে শরীয়তপুর ও ময়মনসিংহে।

১ জন করে রোগী পাওয়া গেছে ৯ জেলায়। এগুলো হলো- চাপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, ঢাকা, গাইবান্ধা, ঝালকাঠি, খুলনা ও নড়াইল। 

বেশি রোগী ও মৃত্যু ২০০৪ সালে: দেশে গত ২৩ বছরের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ২০০৪ সালে ৬৭ জন। সর্বোচ্চ মৃত্যুও ছিল সে বছর ৫০ জনের। সে হিসেবে সেবছর মৃত্যুহার ছিল ৭৫ শতাংশ। এরপর ২০১১ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৩ জন, মৃত্যু ৩৭ জনের ও মৃত্যুহার ৮৬ শতাংশ। ২০১৪ সালে রোগী ছিল ৩৭ জন ও মৃত্যু ১৬ জনের ও মৃত্যুহার ৪৩ শতাংশ। 

এরপর ২০১৩ সালে রোগী ৩১ জন, মৃত্যু ২৫ জন ও মৃত্যুহার ৮১ শতাংশ, ২০১০ সালে রোগী ১৮ জন, মৃত্যু ১৬ ও মৃত্যুহার ৮৯ শতাংশ, ২০০৭ সালে রোগী ১৮ জন, মৃত্যু ৯ জন ও মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ, ২০১২ সালে রোগী ১৭ জন, মৃত্যু ১২ জন ও মৃত্যুহার ৭১ শতাংশ, ২০১৫ সালে রোগী ১৫ জন, মৃত্যু ১১ জন ও মৃত্যুহার ৭৩ শতাংশ, ২০০১ সালে রোগী ১৩ জন, মৃত্যু ৯ জন ও মৃত্যুহার ৬৯ শতাংশ, ২০০৩ সালে রোগী ১২ জন, মৃত্যু ৮ জন ও মৃত্যুহার ৬৭ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে রোগী ছিল ১১ জন, মৃত্যু ৭ জন ও ও মৃত্যুহার ৬৪ শতাংশ।
গত ২৩ বছরের মধ্যে তিনবছর, অর্থাৎ ২০০২ সাল, ২০০৬ সাল ও ২০১৬ সাল নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত ছিল দেশ।

প্রধান লক্ষণ ও সতর্কতা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি স্বাস্থ্য বার্তায় বলা হয়, জ্বরসহ মাথা ব্যাথা, খিঁচুনি, প্রলাপ বকা, অজ্ঞান হওয়া ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হওয়া-নিপাহ রোগের প্রধান লক্ষণ। 

স্বাস্থ্য বার্তায় নিপাহ রোগ প্রতিরোধে খেজুরের কাঁচা রস ও কোনো ধরনের আংশিক খাওয়া ফল না খাওয়ার এবং ফল-মূল পরিস্কার পানি দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, নিপাহ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে অতি দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার পর সাবান ও পানি দিয়ে দুই হাত ভালভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। 

ডিসেম্বর থেকে মে পযন্ত ঝুঁকিপূর্ণ: রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) ঊর্ধ্বতন  বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শারমিন সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৪-৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাস খুব বেশি হয়। এগুলো হলো নওগা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে। তবে যেহেতু খেজুরের কাচা রস সব জেলায় পাওয়া যায়, সে হিসেবে সারা বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের একটাই বার্তা- খেজুরের কাঁচা রস খাবেন না। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. নুজহাত নাদিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের রাজশাহী ও ফরিদপুর অঞ্চলে বেশি নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহীতে মৃত্যু বেশি। 

জানুয়ারির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ি এ বছর সেখানে মারা গেছে ১০ জন। এবারও যেন গত বছরের মতো ভুলটা না করি। এবারও এক জেলায় প্রথমবারের মতো একজন রোগী পাওয়া গেছে। 

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ডিসেম্বর থেকে মে পযন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় রস থাকে ও মানুষ খেতে চায়। কোনভাবেই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। একটা ঝুঁকিপূর্ণ জিনিস খাব কেন। এ জন্য রাজশাহীতে সচেতনতা তৈরি করতে গিয়েছিলাম। সবগুলো উপজেলা থেকে প্রশাসন থেকে শুরু করে গাছি পর্যন্ত- সবাইকে এনেছিলাম।

চিকিৎসা খুবই স্পর্শকাতর: এ ব্যাপারে ডা. শ. ম. গোলাম কায়ছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতবার ১৪ জনের মধ্যে ১০ জনই মারা গেছে। মৃত্যুহার ৭১ শতাংশ। এবার কেবল মৌসুম শুরু। সেই জন্য আমরা আগে থেকেই যে সব জেলায় নিপাহ ভাইরাসের উপদ্রুব আছে, সেখানে অ্যাডভোকেসি করছি। সাধারণত ৩৪ জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে গড়ে রোগী আসে ২৯-৩০ জেলা থেকে রোগী আসে। তাই কোনভাবেই কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। রস সেদ্ধ করে বা গুড় বানিয়ে খেলে সমস্যা নেই। 

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, কারো মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ দেখা গেলে তিনি দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাবে ও পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে নিপাহ ভাইরাস পজিটিভ বা নেগেটিভ। পজিটিভ হলে রোগীদের বেশির ভাগই ঢাকায় আনা হয়। এই রোগের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। রোগীর চিকিৎসায় চিকিৎসক ও নার্সসহ যারাই রোগীর কাছে যাবে, তাদের পিপিই পড়তে হয়। চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ড লাগে। গত বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কিছু রোগী এসেছিল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দু’একজন রোগী ছিল। 

এই চিকিৎসক আরও বলেন, এ ধরণের রোগীর অনেকদিন আইসিইউতে থাকতে হয়। অন্য রোগীদের থেকে পৃথক থাকতে হয়। ডেডিকেটেড আইসিইউ লাগে। তা না হলে চিকিৎসা করা যায় না। সাধারণ হাসপাতালগুলো এই রোগীগুলোকে রাখতে চায় না। কারণ ওখান থেকে আরেকজনের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 
 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত