আমাদের চলচ্চিত্র হারিয়ে গেছে

মধুমিতা সিনেমা হলের স্বত্বাধিকারী, প্রযোজক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ। চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখ। পড়াশোনা করেছেন লন্ডনের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশ রূপান্তর অফিসে আসার কথা ছিল বিকেলে। কিন্তু সূর্য যখন ডুবি ডুবি, তখন হাসতে হাসতে এলেন। দ্রুত ছবি তুলতে গেলেন। এরপর ডিজিটাল স্টুডিওতে শুরু হলো আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, অনলাইন ইনচার্জ মাহতাব হোসেন, প্রতিবেদক তাওসিফ মাইমুন এবং কনটেন্ট এডিটর আব্দুল জব্বার মামুন। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর সাজ্জাদুর রহমান সাজু

যখন ক্যামেরার সামনে তাপস রায়হান আড্ডার ভূমিকা দিচ্ছিলেন, তখন মুচকি মুচকি হাসছেন ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ। লন্ডনের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস ম্যানেজমেন্টে পড়াশোনা করার পর, কীভাবে তিনি মধুমিতা সিনেমা হলের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন, ঢাকাই চলচ্চিত্রের পরিণতি, বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিজস্ব ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন কথা বললেন খোলামেলা। প্রথমেই তাকে বলা হলো

তাপস রায়হান : আপনি পড়াশোনা করেছেন, বিজনেস ম্যানেজমেন্টে। অন্য কোনো চাকরি না করে সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন কীভাবে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : না না, পড়াশোনা শেষ করার পর একটা ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলাম। ১৯৭৬ সালে আব্বা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই ফোন করলেন। তিনি আমাদের কনভিন্স করলেন। বললেন তোমরা যদি দেশে না আসো, তাহলে আমি একা এই সিনেমা হল, মধুুমিতা মুভিজ সামলাতে পারব না। এটা সম্ভব না। তখন মেজো ভাই আর আমি আসলাম। আর ছোট ভাই বাবলু, কলেজে পড়ছিল ও তখন মারা গেছে। তখন আমরা চিন্তা করছিলাম, দেশে আসব কী আসব না। সবকিছু হওয়ার পরও কিন্তু আমরা ব্রিটিশ পাসপোর্ট নেইনি। যাই হোক, আমরা দেশে চলে আসলাম। আর তখন তো মধুমিতা সিনেমা হলের প্রাইম টাইম।

মাহতাব হোসেন : কোন ছবির ব্যবসা সফলে সবচেয়ে বেশি মোহগ্রস্ত হলেন এই ব্যবসায়? সিনেমা হল ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি মজা পেলেন কবে? তখন তো আপনারা মধুমিতা মুভিজের ব্যানারে সিনেমা বানানো শুরু করলেন? 

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : আব্বার শেষ ছবি ছিল ‘এক মুঠো ভাত’। কিন্তু তিনি দেখে যেতে পারেননি। ছবিটা জমা দেওয়ার পরই আব্বা মারা যান। স্বাধীনতার পর তখন কিন্তু এফডিসিতে একটা লাইন পড়ত, ছবি রিলিজের সময়। যখন ছবিটি রিলিজ করা হয়, তখনো আব্বা মারা যাওয়ার ৪০ দিন হয়নি। আমাদের ইচ্ছে ছিল না। ভেবেছিলাম, কিছুদিন অপেক্ষা করি। আব্বা যে তারিখটা নির্দিষ্ট করে গিয়েছিলেন, সেই তারিখেই মুক্তি দেব। যাই হোক, রিলিজ দেওয়া হলো। ছবিটা তখন ফ্লপ করল। দ্বিতীয়বার ৬ মাস পর আবার যখন ছবিটা রিলিজ দেওয়া হয়, তখন সুপার হিট। তখন আমার ভাই বলত, ‘এক মুঠো পোলাও’। আমাদের প্রোডাকশন হাউজে হলো ‘নকল মানুষ’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘উৎসগর্’ এগুলো সব ছিল ফ্লপ। এরপর তো ‘আগুন’ হলো। আবার ‘নিশান’ ছবি হলো সুপার ডুপার হিট।

মাহতাব হোসেন : মধুমিতা হলে সবচেয়ে ব্যবসা করেছে কোন সিনেমা?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : ‘টাইটানিক’। ৩৮ সপ্তাহ চলেছে। আজ পর্যন্ত এই ছবির চেয়ে ব্যবসাসফল ছবি পাইনি।

তাওসিফ মাইমুন : বর্তমানে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমার বাজার সুখকর নয়। কিন্তু বাইরের দেশের ছবি ভারত,  ইরান, মিসর, পাকিস্তান বা অন্য দেশের ছবি আমদানি করা হলে, সেটি কতটুকু ব্যবসাসফল হবে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : দেখেন, কেবল শাহরুখ খানের ছবি ছাড়া কিন্তু আমাদের দেশে হিন্দি ছবি তেমন চলে না। যদি কোনো সমস্যা থাকে, সেটা আমদানিকারকদের।

তাওসিফ মাইমুন :  এ সময়ে এসে কোন নায়ককে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে জনপ্রিয় মনে হয়?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : এক কথায় শাকিব খান। 

মাহতাব হোসেন : বাংলাদেশের অনেক ছবি বিশে^র অনেক দেশে মুক্তি পাচ্ছে। বেশ কিছু ছবি ব্যবসাও করেছে। কিন্তু সম্প্রতি একটি ছবি আমেরিকায় মুক্তি পেয়েছে। অনেকেই এই ছবির বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশে^র বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ছবির যখন বাজার শুরু হচ্ছে তখন এ ধরনের ছবি কি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য হুমকি হচ্ছে না?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : আপনার প্রশ্নটি সঠিক। অ্যাবসোলিউটলি থ্রেট। এটা বিরাট সমস্যা। দুঃখ হয় এ ভেবে, এক সময় আমাদের কত কিছু ছিল। শক্তিশালী স্ক্রিপ্ট ছিল। অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিল। গীতিকার ছিল। মিউজিক ডিরেক্টর ছিল। এক সময় আমরাই তো অনেককে সোনারগাঁও, ঢাকা ক্লাবে রুম বুক করে দিতাম। বলতাম, নিশ্চিন্তে আপনি স্ক্রিপ্ট লিখুন, গান লিখুন। তখন একটা টিম ছিল। সেটার রেজাল্ট দেখেন। দূরদেশ ছবির গান যেও না সাথী। আবার চুরি করেছ আমার মনটা, হায়রে হায় মিস লংকা। রুনা লায়লার গাওয়া গান মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না। এখন এসব কোথায়? একজন স্ক্রিপ্ট রাইটারকে সেই পরিবেশ দিতে হবে। তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। আসলে এক্ষেত্রে তাদের জন্য ছবির একটা পার্সেন্টেজ থাকতে হবে। তাহলে তারা মোটিভেট হবে। না হলে সম্ভব না। ভালো গল্পের ছবি হলেই, চলচ্চিত্র উন্নত হবে, চলচ্চিত্রে আলো আসবে। দর্শক সিনেমা হলে আসতে বাধ্য হবেন। লক্ষ করেন, আগে কিন্তু পরিবারের সবাই ছবি দেখত। এখন? আপনি নিউ জেনারেশনের জন্য কিছু ভাবছেন? আমি মনে করি, আমরা যদি ভালো ছবি চালাই, তাহলে মধুমিতা আবার ফিরে আসবে।

মাহতাব হোসেন : আমি বলতে চাইছি, একটি ছবি যখন সেন্সর করা হয় সে রকম রপ্তানির ক্ষেত্রের এ রকম কোনো নিয়ম থাকা দরকার কি না?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : আমি টোটালি এগ্রি করি। আমরা যদি ভালো মানের ছবি রপ্তানি করতে না পারি, তাহলে যে দর্শক আমরা বিদেশে পেয়েছি তা হারাতে পারি।

তাওসিফ মাইমুন : এ সময় আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নতুনদের সম্ভাবনা কেমন? 

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : বেশ কয়েক জনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে অনেকের সমস্যা হচ্ছে তারা দু-চারটা ছবিতে অভিনয় করেই নিজের মধ্যে একটি পরিবর্তন নিয়ে আসে।  কেমন যেন? অনেকটা অহংকারী। নিজেকে তারা সুপারস্টার ভাবেন।

তাপস রায়হান : সমস্যাটা কি ওদের মধ্যে নাকি অন্য জায়গায়? ওদের গ্রুমিং কি ঠিকমতো হয়েছে? 

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : তা হয়নি। এটা জটিল সমস্যা। তবে একটা কথা বলি। এটা অব দ্য রেকর্ড। (তাকে বলা হলো, লেখার সময় কিন্তু লেখা হয়ে যেতে পারে। তখন আমাদের দোষ নেই। তিনি হাসলেন।) তাহলে নাই বলি।

মাহতাব হোসেন : ‘প্রিয়তমা’ ছবির পর ‘তুফান’। এই ছবিটি কেমন ব্যবসা করেছে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : খারাপ না। ৫ সপ্তাহ চলেছে। এরপর তো একটা অস্থিরতা শুরু হলো। আমরা তখন বন্ধ করতে বাধ্য হই।

মাহতাব হোসেন : দেশে একটা ক্রাইসিস চলছে। এ সময় অনেক ভালো ছবি রিলিজ দেওয়া হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে কি হলগুলো ‘জিরো’তে নেমে আসবে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : কবেই তো নেমে আসছে, ফিনিশড। আমরাই তো গত ২৮ নভেম্বর সিনেমা হল বন্ধ করে দিয়েছি। যেসব ছবি প্রডিউস হচ্ছে,

সেগুলো সিনেমা হলে চালানোর মতো না। আমি যখন সেন্সর বোর্ডে চিলাম, তখন সচিবরা এ ধরনের ছবি দেখে ঠাট্টা করত। অনেক চলচ্চিত্র পরিচালককে তারা ধমকও দিয়েছেন। এখন অনুদানের ছবিগুলোও সেই ধরনের। একজন ফটোকপি মেশিনওয়ালা অ্যাপ্লাই করে নাকি ছবি পেয়ে গেছে। এখন বলেন, ও কী ধরনের ছবি বানাবে? ছিছিছি। আমরা যাচ্ছি কোথায়!

তাপস রায়হান : তাহলে এই চক্র থেকে মুক্তির উপায়?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : সরকারের একটি বোর্ড থাকা দরকার। যেখানে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সব শ্রেণির মানুষ থাকবেন। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। ভালো ছবি হলে দর্শক আসবেই।

মাহতাব হোসেন : এফডিসির অবস্থা তো দিন দিন খারাপ হচ্ছে। উত্তরণের উপায় নেই?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : (ঠোঁট উল্টে দুই পাশে মাথা নাড়ালেন) নাহ, সম্ভাবনা নেই। এফডিসিতে এখন হরর পরিবেশ। এখানে আর কোনো ছবি নেই। গাঁজাখোরদের আড্ডা চলে। যত ধরনের খারাপ কাজ করা যায়। আর কোনো প্রত্যাশা নেই।

তাপস রায়হান : এফডিসি প্রশাসন কী করে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলি, তাদের কিছু করার নেই।

তাপস রায়হান : একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি স্কোয়াশ খেলার পাগল। স্কোয়াশ ফেডারেশনে ছিলেন। এই পছন্দের কোনো কারণ রয়েছে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ :  হাহাহা। না তেমন কোনো কারণ নেই। তবে মাই ফার্স্ট লাভ ইজ স্কোয়াশ। তবে স্কোয়াশের প্রতি ভালোবাসার একটা গল্প আছে। বললেন মেট্রিক পাসের পর আব্বা আমাকে লন্ডন পাঠিয়ে দেন পড়াশোনা করার জন্য। ১৯৭৪ সালে আম্মা মারা গেলে দেশে আসার পর আবার লন্ডনে ফিরে গেলাম। তখন আমার ব্রিটিশ বন্ধুরা স্কোয়াশ খেলত। এক পাকিস্তানি বন্ধুও এই খেলায় ছিল। ও দারুণ  খেলত। সেই-ই আমাকে উৎসাহ দিত নিয়মিত খেলার জন্য। এর আগে তো স্কোয়াশ দেখিনি কখনো। এরপর লন্ডনের এক জিমনেসিয়ামে গিয়ে পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের স্কোয়াশ খেলা দেখে মুগ্ধ হই। দেখি কি, বল মাটিতে পড়ে না। দারুণ ভালো লাগল। আমিও তখন খেলা শুরু করলাম। সেই যে শুরু হলো, এখনো খেলছি। জানি না, কতদিন খেলতে পারব। আমি যদি স্কোয়াশ খেলতে খেলতে মারা যাই, এর চেয়ে আনন্দের কিছু নেই।

আব্দুল জব্বার মামুন : ফার্স্ট লাভ ইজ স্কোয়াশ বললেন। সেকেন্ড লাভ কী?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : আমার দেশ এবং চলচ্চিত্র। এ দেশকে ভালোবেসেই তো আমি মধুমিতায়।

তাপস রায়হান : মধুমিতা সিনেমা হল আবার কবে চালু হবে?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : একটা ভালো বিদেশি ছবির অপেক্ষা করছি। আসলে আমরাই দায়ী আমাদের চলচ্চিত্রকে এই অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য। অন্য কাউকে দোষ দেওয়ার আগে, নিজেকে দেখলেই হয়। এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য আমি কি না করেছি? অথচ আমাকে এফডিসিতে অপমান করা হলো!  আমাদের ইন্ডাস্ট্রির কোন কোন লোক এর সঙ্গে জড়িত, আমি তাও জানি। মৃত্যুর আগে কবরী ম্যাডাম আমাকে সব বলে গেছেন।

তাওসিফ মাইমুন : আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির এই দশা কেন হলো?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : সরকারের পলিসি। যৌথ উদ্যোগ বন্ধ হওয়ার পরই চলচ্চিত্রে ধস নেমে আসে। বিপর্যয়ের এটাই মূল কারণ। 

আব্দুল জব্বার মামুন : আপনার পরিবার নিয়ে কিছু বলুন?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : আমার ২ ছেলেমেয়ে। ওরা বিদেশে থাকে। দুজনই বিয়ে করেছে।  এখন আমি নানা, দাদা। ছেলে এখন মেটাতে কাজ করছে। আর আমার জন্ম পুরান ঢাকার চকবাজারে।  কিন্তু ১৯৫৯ সালে ধানম-ি ৫ নম্বরে চলে যাই। তখন ১ বিঘা জায়গা আব্বা কিনেছিলেন ১০০০০ টাকা দিয়ে। সেখানেই আছি।

তাপস রায়হান : এমন একটা ঘটনা বলেন, আগে কাউকে বলেননি?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : তেমন কোনো কথা নেই। হাহাহা। সত্যি কথা কি, এমন কোনো ঘটনা নেই যা আগে কাউকে বলিনি। কেউ না কেউ তো শুনেছেই। এখন বলব, পরে মনে হবে আরে এই ঘটনা তো আরেক জায়গায় বলেছি। সুতরাং ...।

তাপস রায়হান : শেষ ইচ্ছা?

ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ : সবাই যেন শান্তিতে থাকে। আর মৃত্যুর আগে মনের মতো একটা চলচ্চিত্র তৈরি করতে চাই। আব্বা যেন পরপারে থেকে শান্তি পান। তিনি জানবেন, আমরা তার স্বপ্ন পূরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। 

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : মহুবার রহমান

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ