৭১’র অমীমাংসিত সমস্যা মীমাংসার আহ্বান পাকিস্তানকে

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ২০২১ সালের এপ্রিলে ডি-৮-এর চেয়ারের পদ গ্রহণের পর থেকে বেশ চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ডি-৮ সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। মিসরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, কভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে আমরা প্রথমে সীমাবদ্ধতা ও বাধা-বিপত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, এরপর ‘বহুবিধ সংকট আমাদের অনেক দেশকে নানাভাবে ভুগিয়েছে’। খবর : বাসস।

বাংলাদেশের বিদায়ী চেয়ার হিসেবে ড. ইউনূস ১১তম ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের স্বাগত জানান। তিনি ঐতিহাসিক কায়রো নগরীতে নিখুঁত আয়োজন ও সদয় আতিথেয়তা প্রদানের জন্য আগামী চেয়ারম্যান ও সম্মেলন আয়োজক দেশ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, অগ্রগতি ও সহযোগিতার জন্য সংগঠনের নীতির প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে অবশ্যই মিসর সরকারের প্রশংসা করতে হবে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ডি-৮-এর চেয়ার থাকাকালে ডি-৮ ইয়ুথ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা এবং ডি-৮ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি অনুস্বাক্ষরের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।

ড. ইউনূস বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অকুণ্ঠ সমর্থন ও সামষ্টিক স্বার্থ অনুধাবন ছাড়া এটি অর্জন করা সম্ভব হতো না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের চেয়ারম্যানশিপে সমর্থন এবং আমাদের সম্মিলিত স্বার্থকে এগিয়ে নিতে যে অঙ্গীকার দেখানো হয়েছে, তার জন্য বাংলাদেশ ডি-৮-এর সব সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ।

তিনি বলেন, “আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে মিসরের কাছে চেয়ারম্যান পদ হস্তান্তর করার এই লগ্নে আমি এই শীর্ষ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘যুবকদের জন্য বিনিয়োগ ও এসএমইকে সহায়তা করা’ নির্ধারণের জন্য প্রেসিডেন্ট এল-সিসির প্রশংসা করছি। এটি ডি-৮-এ আমাদের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”

প্রধান উপদেষ্টার মতে, ডি-৮ দেশগুলোকে অবশ্যই ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে যুব ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনশীল প্রকৃতির আলোকে শিক্ষাকে পুনরায় আবিষ্কার ও তার অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে সরকারের পক্ষে তা অনুধাবন এবং কমসূচি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধন অব্যাহত রাখতে হবে।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘মিসরের কাছে বাংলাদেশের দায়িত্ব হস্তান্তরের এই মুহূর্তে আমি চেয়ার হিসেবে আমাদের সহযোগিতামূলক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে মিসরের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি।’

তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আল-সিসির বিজ্ঞ নেতৃত্বে মিসর বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখতে পারে। ড. ইউনূস বলেন, ‘মিসরের নেতৃত্বে ডি-৮ বিকশিত হোক এবং সদস্য দেশগুলোকে একটি অনিশ্চিত বিশে^ বৃহত্তর স্বাধীনতা, স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করুক।

একাত্তরের অমীমাংসিত সমস্যা মীমাংসার আহ্বান : প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো মীমাংসা করার আহ্বান জানিয়েছেন। ডি-৮ সম্মেলনের ফাঁকে মিসরের রাজধানী কায়রোর একটি হোটেলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি বলেন, ‘বিষয়গুলো বারবার আসছে। আসুন আমরা সামনে এগিয়ে যেতে সেই বিষয়গুলোর ফয়সালা করি।’

জবাবে শরিফ বলেন, ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত বিষয়গুলো মীমাংসা করেছে, কিন্তু যদি অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যা থাকে, তবে সেগুলো দেখতে পেলে তিনি খুশি হবেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিষয়গুলো চিরতরে সুরাহা করে ফেলা ভালো হবে।

এ সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান। শরিফ বলেন, ‘আমরা সত্যিই আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার অপেক্ষায় রয়েছি।’

তিনি সার্ক পুনরুজ্জীবনে অধ্যাপক ইউনূসের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং আঞ্চলিক সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানান। অধ্যাপক ইউনূস শরিফকে বলেন, ‘এটি একটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

তিনি বলেন, ‘আমি সার্কের ধারণার একজন বড় অনুরাগী। আমি ইস্যুটি নিয়ে কথা বলেই যাব। আমি সার্ক নেতাদের শীর্ষ সম্মেলন চাই। যদিও তা কেবল একটি ফটোসেশনের জন্যও হয়, তবুও এটি একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করবে।’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালিত চিনিকলগুলোকে আরও ভালোভাবে পরিচালনার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রস্তাব দেন।

অধ্যাপক ইউনূস শরিফকে তার সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং আশা করেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ড. লুৎফে সিদ্দিকী। সিদ্দিকী পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দারকে ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফও অধ্যাপক ইউনূসকে তার সুবিধামতো সময়ে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান।