জ¦ালানি তেলের পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে ১৪ বছর আগে চার বছরমেয়াদি দ্বিতীয় শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার মূল কাজ শুরু হয়নি এখনো। তবে জমি অধিগ্রহণ, পরামর্শক, প্রস্তাবনা প্রণয়নসহ বিভিন্ন খাতে এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
বিগত সরকারের আমলে নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এখন নতুন করে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ খুঁজছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় সাগর থেকে পাইপলাইনে আমদানি করা জ¦ালানি তেল কম খরচে ও কম ব্যয়ে আনার জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বেশি দামে পরিশোধিত জ¦ালানি তেল আমদানির ফলে কৃষি, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে এর প্রভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গত ১৫ নভেম্বর জানান, দেশের একমাত্র জ¦ালানি তেল শোধনাগার পুরনো হয়ে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ভেঙে পড়তে পারে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আরও একটি তেল শোধনাগার করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এত দিন দুর্বৃত্তায়নের কারণে ওই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। এখন ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
যে কারণে দ্বিতীয় তেল শোধনাগারের উদ্যোগ : দেশের বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন জ¦ালানি তেলের চাহিদা রয়েছে এবং চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়। বছরে গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন পরিশোধিত জ¦ালানি তেল এবং ১২ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল আমদানি করে থাকে বিপিসি।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন। এটি পরিচালনা করে জ¦ালানি বিভাগের অধীনে থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)।
ইস্টার্ন রিফাইনারির বয়স এখন ৫৬ বছর। এর ‘ইকোনমিক লাইফ টাইম’ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় নানা রকম জটিলতা তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া দেশে জ¦ালানি তেলের চাহিদা বাড়তে থাকায় দ্বিতীয় শোধনাগারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।
যেসব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি : ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তা না হওয়ার পেছনে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবের পাশাপাশি, রাজনৈতিক বিবেচনায় গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা, দাপ্তরিক কাজে ধীর গতি, কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার অভাব দায়ী বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২০০ একর জায়গার একপাশের ৭০ একর জায়গায় দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের জন্য বাড়তি জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। পরে সংশোধিত হয়ে প্রকল্পের ব্যয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হলে তারা প্রকল্পটির (ইআরএল-২) ডিজাইন সম্পন্ন করে। অন্যদিকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে। সর্বশেষ সংশোধন করে প্রকল্পব্যয় ধরা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার ১৬ হাজার ১৪২ কোটি টাকা আর বিপিসি ৬ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা খরচ করার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাবও ঝুলে যায়।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে গত ফেব্রুয়ারিতে এ প্রকল্পে যুক্ত হয় এস আলম গ্রুপ। প্রকল্পটি সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বমূলক উদ্যোগের ভিত্তিতে বিপিসি ও এস আলম মিলে এটি বাস্তবায়নে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এস আলমের প্রস্তাবে দ্বিতীয় তেল শোধনাগারে তাদের ৮০ শতাংশ অংশীদার করার কথা বলা হয়েছিল। যদিও এ নিয়ে তখন বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি ওঠে।
শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত ২৯ আগস্ট ওই প্রকল্প থেকে এস আলম গ্রুপকে বাদ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
একই সঙ্গে প্রকল্পটির বৈদেশিক মুদ্রার হালনাগাদ দর অনুযায়ী প্রাক্কলন এবং সব ক্রয় পরিকল্পনা পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পাঠাতে বিপিসিকে নির্দেশ দেয় জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।
প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা : বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, নির্দেশনা পেয়ে তারা এখন ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শুরু করেছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগ খোঁজা হচ্ছে। এসব কাজ দ্রুততার সঙ্গে করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে অন্য এক কর্মকর্তা জানান, বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এবং ইআরএলের অর্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়নেরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
পুরোপুরি কাজে আসছে না এসপিএম : দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন করা হবে, এটা ধরে নিয়েই সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) বা সাগরে ভাসমান জেটি নির্মাণ ও পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। যার মাধ্যমে সরাসরি সাগরের জাহাজ থেকে কম খরচে দ্রুত জ¦ালানি তেল সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
এসপিএমের মাধ্যমে দুটো আলাদা পাইপলাইন দিয়ে বছরে ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত এবং ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ¦ালানি তেলসহ ৯০ লাখ টন তেল সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। এখন পরিশোধিত জ¦ালানি তেল সরবরাহ করে পাইপলাইন পুরোপুরি কাজে লাগলেও অপরিশোধিত জ¦ালানি তেল ৪৫ লাখ টন আমদানি করা যাবে না। কারণ পরিশোধন সক্ষমতা নেই। ইআরএল-২ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এসপিএম প্রকল্প পুরোপুরি কাজে আসছে না।