কুয়াশায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

শীত আসার পর সময়ের সঙ্গে বাড়ে কুয়াশা। নদী অববাহিকা, মাঠ-ঘাট, বিল-ঝিল ঢাকা পড়ে কুয়ার ধূসর চাদরে। কখনো কখনো ঘন কুয়াশায় ঢাকা নেমে আসে সড়ক-মহাসড়কে। আর এতেই বিপত্তিতে পড়েন সড়কগুলোতে চলাচল করা গাড়ির চালকরা। চলতি বছর হেমন্তের শেষ থেকেই শুরু হয় সড়ক-মহাসড়কে কুয়াশার প্রতিবন্ধকতা। পৌষ মাসে এসে তা আরও বেড়েছে। 

কনকন শীতের পাশাপাশি কুয়াশার ঘনত্ব বাড়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়েছে। বেড়েছে গাড়ির চালক ও মালিকদের উদ্বেগ। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুয়াশার সময় দুর্ঘটনা রোধ করার উপায় আছে কেবল চালকদের হাতে। ঘন কুয়াশার মধ্যে গতি কমিয়ে সতর্কভাবে গাড়ি চালালেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, গত নভেম্বর মাসে সড়কে ৪১৫ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৯৭ জন নিহত হয়। আর এ দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে ঘটছে। ঘন কুয়াশার কারণে একটি যানবাহনের সঙ্গে আরেকটি ধাক্কা লেগে বা সংঘর্ষে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৩ ডিসেম্ব ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার আসার পথে শ্রীমঙ্গল পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের সামনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে হানিফ পরিবহনের একটি গাড়ি। গত ১৪ ডিসেম্বর ঘন কুয়াশায় পাবনার ঈশ্বরদী ও এর আশপাশের এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা বাড়তে দেখা যায়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভৈরব উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকায় গত ১৬ ডিসেম্বর কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় একটি অটোরিকশা দুমড়েমুচড়ে প্রাণ হারায় পাঁচজন। একই দিনে এই রুটে নরসিংদীর রায়পুরায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষে হাবিবুর রহমান টিটু (৪০) নামে এক ট্রাক চালক নিহত হন। এ সময় আহত হয়েছেন বাসের চালকসহ তিনজন। আর গত শুক্রবারও ঘন কুয়াশায় ১২টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে।

ঢাকা-সিলেট রুটে চলা শ্যামলী পরিবহনের চালক রহমত মিয়া বলেন, ‘গত সপ্তাহে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটছে এই রুটে। মূলত ঘন কুয়াশায় সামনের গাড়ি দেখা যায় না। ফলে গতি বেশি থাকায় হঠাৎ কুয়াশার জন্য পেছন থেকে গাড়ি ধাক্কা দেওয়ায় দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। আমিও গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-সিলেট রুটে ভৈরব এলাকায় অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম।’

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলা হানিফ পরিবহনের এক চালক মো. বাদশাহ বলেন, ‘চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা বেশিরভাগ রাতে চলাচল করেন। কিন্তু কুয়াশা পড়ার পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহ এ রুটে দুর্ঘটনা বাড়ছে। আর সড়কে অনেক জায়গায় বাতি দেখা যায় না। ফলে কুয়াশার জন্য রাস্তা ভালোভাবে দেখা যায় না। অনেক জায়গায় সড়কেই সাইন নেই। ফলে কুয়াশার সময় এই সড়ক দিয়ে গাড়ি চলাচলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সড়ক দিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসলাম। আমার লেনেই আটটির মতো দুর্ঘটনা চোখে পড়েছে, যা শুধু কুয়াশার জন্য ঘটেছে। আর অন্য পাশের লেনসহ কম হলেও ১২টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে শুধু এক দিনেই। তাহলে আমাদের বাকি সড়কগুলোর অবস্থা অনুমান করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘কুয়াশার কারণে ঘটা দুর্ঘটনা রোধের জন্য চালকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। আর সড়কের সাইনগুলো ভালো করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে মোটরসাইকেল চালকদের গাড়ি চালানোর সময় অবশ্যই নিরাপত্তার জন্য সব সরঞ্জাম পরিধান করতে হবে। আর মহাসড়কে চালকদের কুয়াশার সময় গতি তাদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। যেন কোনো ধরনের কিছু ঘটার আগে গতি কমাতে পারেন চালকরা। সেই সঙ্গে হাইওয়েতে কুয়াশার সময় আরও মনিটরিং বাড়ানো দরকার।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুয়াশার সময় যানবাহনগুলোকে ফগ লাইট ব্যবহার করা উচিত। কারণ, এই ফগ লাইট দিয়ে গাড়ি চালালে সামনের দিকের অবস্থান কিছুটা হলেও ভালো দেখা যাবে। আর গাড়িগুলোকে বাম পাশ ঘেঁষে চালানো উচিত। কুয়াশা যেসব এলাকায় বেশি পড়ে, সেখানে গাড়ির চালকদের উচিত গতি কম রাখা। তাছাড়া, কুয়াশা যেহেতু প্রাকৃতিক একটি সমস্যা, তাই চালকদের সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। সব বিষয়ের জন্যই সরকারের উচিত এসব বিষয় মনিটরিং করা।’