দেশে শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষায় গবেষণা করতে হলে শিক্ষার বাজেট বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে এটা হঠাৎ করে হবে না। এ ব্যাপারে আমার মাথায় যে চিন্তাগুলো আছে তা হলো কাদের দিয়ে শুরু করব প্রাইমারি শিক্ষক নাকি বেসরকারি খাতের এমপিওভুক্ত শিক্ষক, যারা ১২ হাজার টাকা বেতন পান। তাদের এমপিও বাড়াব নাকি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মান মর্যাদা বাড়াব? কোনটা আগে করব। আপনারা আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন।’
গতকাল রবিবার ‘উচ্চশিক্ষায় বৈশ্বিক মান : বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে এ সম্মেলনের আয়োজন করে দৈনিক বণিক বার্তা। অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এ খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন। তাদের কেউ কেউ রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস করা, নিয়োগ ও পদোন্নতি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিভাজন দূর করা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও পিএইচডির সুযোগ সৃষ্টি করা, ইন্ডাস্ট্রি ও শিক্ষার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করাসহ শিক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন। আর উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দেন বক্তাদের কেউ কেউ।
দেশে গত কয়েক দশক ধরে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের চর্চাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পঙ্গু করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন শিক্ষা উপদেষ্টা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু দলীয়করণ নয়, দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতির নামে ক্ষমতার প্রদর্শনসহ নানা সমস্যা বিরাজমান। কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা গত দেড় দশকে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পঙ্গু হওয়ার পথে। এ কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা বন্ধ করতে দেশের উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করতে হবে।’
উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় যে একটা বড় সমস্যা আছে, তা দেখা যায় কতগুলো দিকে তাকালে। একটা হলো এইচএসসি পাস করার পরই যারা মেধাবী ছাত্র, যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাদের কেন এত বিদেশে চলে যেতে হবে? আমরা যখন এইচএসসি পাস করেছিলাম, তখন তো এটার কথা চিন্তা করতাম না। আর আমাদের দেশে যারা উচ্চশিক্ষা পাস করে বের হচ্ছে, তাদের মধ্যে তো কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দিয়েছে। শিক্ষিত বেকারের সমস্যা আমাদের এত ছিল না। এখন এটি আশঙ্কজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা উপযুক্ত মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছি না, সেটাও দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে। কাজেই উচ্চশিক্ষায় সমস্যা আছে, কোনো সন্দেহ নেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষার পরিবেশ বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ক্রমাগত অধঃপতিত হয়েছে। এর পেছনে যেসব কারণ আছে, সেগুলো সবারই জানা। এর মধ্যে আছে শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতির নামে দখলদারত্ব ও দুর্বৃত্তায়ন এগুলো সবই জানি।’
উচ্চশিক্ষার জন্য কিছু করণীয় বিষয়েও আলোকপাত করেন শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ইউজিসির কর্মপরিধি বাড়িয়ে এটিকে উচ্চশিক্ষা কমিশন বা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন নামকরণ করে কিছু কিছু নতুন কর্মপরিকল্পনা বা দায়িত্ব দেওয়া যায় কি না, সেটি চিন্তা করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিদেশে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার একটা সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে চাই। এখন আমরা যে চেষ্টা চালাচ্ছি, অল্পস্বল্প সময়ের জন্য দলীয়করণ বাদ দিয়ে একটি পরিবেশ তৈরির যে চেষ্টা চলছে, এটি যদি অব্যাহত থাকে, যেখানে মেধার স্বীকৃতি ও প্রকৃত মূল্যায়ন হবে এবং বৈশ্বিক মানের উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যেন আরও আগ্রহী হতে পারি। এ ছাড়া আগের মতো দলীয় রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তায়ন ও দলখদারির ছাত্ররাজনীতি যেন আর ফিরে না আসে।’
দেশের বাইরে থাকা ভালো শিক্ষক ও গবেষকদের ফিরিয়ে আনতে কাজ করা হচ্ছে উল্লেখ করে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি বড় সুযোগ হবে। রিভার্স ব্রেইন ড্রেন হতে পারে। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের শিক্ষা-গবেষণায় ভালো কাজ করতে হবে।’
বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ, সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া, আইইউবিএটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রব, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম লুৎফর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (অস্থায়ী) অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহিনুল আলম, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোসলেম চৌধুরী, অধ্যাপক ম. তামীম, রেজোয়ান খান, গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান, প্রাণ আরএফএলের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির এজাজ বিজয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা প্রমুখ।