জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান

৮১ বেওয়ারিশ লাশ দাফনের অভিজ্ঞতা জানালেন তারা

‘এই কবরগুলোতে যারা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন, তাদের সবার পিতৃপরিচয় ছিল, ছিল তাদের পরিবার। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের কারণে তারা আজ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হলো। তারা তো বেওয়ারিশ ছিল না।’ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানের ৪ নম্বর ব্লকের একটি সাইনবোর্ডে এই লেখাগুলো চোখে পড়বে। যা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের এখানে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। আজ সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) সরেজমিন ঘুরে বিষয়টি দেখা গেছে।

রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। ছবি: ইমানুল সোহান

রায়েরবাজার কবরস্থানের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও আঞ্জুমান মুফিদুল সংগঠনের দেওয়া তথ্যমতে, ছাত্র আন্দোলনে চলাকালে গত ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থানে ৮১টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটি লাশ মর্গ থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে নিয়ে আসে আন্জুমান মুফিদুল। তারপর সেই লাশগুলোর জানাজা শেষে আলাদা আলাদা করে দাফন করে কবরস্থানের কর্মচারীরা। সেই বেওয়ারিশ লাশগুলো দাফনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে দেশ রূপান্তরের। তারা লাশ দাফনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন ।

রায়েরবাজার কবরস্থানের কবর খোদাইকারি গোলাম রাব্বানি। কবর খোদাই ও লাশ দাফনে যার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি কবর খোদাই ও লাশ দাফনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ৮১টি লাশ ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আজ সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) রায়েরবাজার কবরস্থানে সেই সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুরের অবস্থা খুবই ভয়াবহ ছিল। ছাত্রদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে এই এলাকা ছিল রণক্ষেত্র। এর মধ্যেই আঞ্জুমান মুফিদুল বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ আনতে শুরু করে। সেই লাশগুলো আমরা রিসিভ করে দাফন করি। এই লাশগুলো দাফন করতেও সেই সময় ভয় কাজ করতো। তবে ভয়ের মধ্যেও আমরা কবর খুঁড়ে জানাজা করে প্রত্যেককে দাফন করেছি। তাই নিজের কাছে এখন ভালই লাগে।’

৮১টি লাশ এইখানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। যা চিনতে একমাত্র ভরসা বাঁশের খুঁটি। ছবি: ইমানুল সোহান

তিনি আরও বলেন, ‘আগে বেওয়ারিশ লাশের কবর খুঁজতে স্বজনরা আসলেও গত কিছুদিন ধরে তেমন কেউ আসছেন না। এই লাশগুলো মধ্যে কতজন জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান শহিদ সেই সংখ্যা বলাটা কঠিন। তবে লাশ দেখে মনে হয়েছে অধিকাংশই জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শহিদদের লাশ।’

কবরস্থানে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে দারোয়ার হিসেবে কর্মরত আছে মো: আলমগীর হোসেন। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময়েও তিনি গেটে  দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কাছে সেই সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলন চলাকালে আমরা খুবই ভয়ের মধ্যে ছিলাম। কারণ সেই সময়ের পরিস্থিতি বলে বুঝাটা খুবই কঠিন। সময় যতই গড়াতে থাকে জুলাইতে তত বাড়তে থাকে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা। লাশগুলো অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসতে থাকে আঞ্জুমান মুফিদুল সংগঠনের সদস্যরা। এমনও দিন গেছে একই দিনে ১০ থেকে ১৫টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এভাবে মোট ৮১টি লাশ দাফন করা হয়েছে শুধু ‍১ ‍জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত।’

এই লাশগুলো রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের মর্গ থেকে সংগ্রহ করেছেন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবাকর্মকর্তা কামরুল আহমেদ। তার কাছে লাশ সংগ্রহের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের মর্গ ও রাস্তা থেকে ৮১টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আমি পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। সেই লাশগুলো পরে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে নিয়ে আসি। এটি আমাদের স্বাভাবিক কাজ ছিল। তবে জুলাই-আগস্ট বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বেড়ে যায়। পরে লাশগুলো রায়েরবাজার কবরস্থানের দায়িত্বরতরা দাফন করেছেন।’

বিষয়টি সম্পর্কে রায়েরবাজার কবরস্থানের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মো. ফেরদাউস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৮১টি লাশ আন্জুমান মুফিদুল রায়েরবাজার কবরস্থানে নিয়ে আসে। যাদের সবাই বেওয়ারিশ। পরে তাদের গোসল করিয়ে দাফন করা হয়। তবে তাদের মধ্যে কতজন জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নিহত সেই হিসেব আমাদের কাছে নেই। তবে অধিকাংশ মরদেহের শরীরে গুলির চিহ্ন দেখেছেন তিনি।’