পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাংগা ইউনিয়নের পূর্ববানিয়ারী গ্রামের দিনমজুর মৃত আফজাল শেখের ছেলে কামরুল শেখ (৪৫)। কিছুদিন আগেও মানুষের বাড়িতে জাইগির থেকেছেন। অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। সেই কামরুল শেখ মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে হয়েছেন কোটিপতি। এলাকায় কিনেছেন অর্ধশত বিঘা কৃষিজমি। নিজ গ্রামে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন তিনটি আলিশান ভবন। সিলেটের সুনামগঞ্জের হাওরে রয়েছে তার বিলাসবহুল হাউজবোট। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে রয়েছে বিশাল শোরুম। আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে দিঘিরজান বাজারে স্কুলের জমিতে অবৈধভাবে খাল দখল করে নির্মাণ করেছেন মার্কেট। পদ-পদবি না থাকলেও এলাকায় তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।
এলাকাবাসী জানান, আওয়ামী লীগ আমলে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের ভাই নুরুল ইসলাম বাবুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলের এই কামরুল। তার প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় বেপরোয়া চলাফেরা করতেন তিনি। কোনো মতে এসএসসি পাস করা কামরুল বাবুলের সুপারিশে ঢাকার একটি কোম্পানিতে চাকরি নেন। পরে সেখানে বিএ পাসের ভুয়া সনদ দিয়ে বাগিয়ে নেন কোম্পানির উচ্চপদ। সাত বছর আগেও ভিটা ছাড়া আর কিছুই ছিল না কামরুলের। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানেই কোটিপতি বনে যাওয়ায় তাকে নিয়ে এলাকাবাসীর কৌতূহলের শেষ নেই।
কামরুল শেখের চাচা মুক্তিযোদ্ধা আজাহার আলী শেখ বলেন, কামরুল শেখের স্ত্রী রেখা খাতুন অফিস সহকারী হিসেবে চাকরি করেন নাজিরপুরের মাটিভাংগা ডিগ্রি কলেজে। তার স্ত্রী বেতন পায় ২৫-৩০ হাজার টাকা। কামরুল শেখ কোম্পানির চাকরি থেকে বেতন পান ৬০-৭০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়েই কষ্ট করে এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে তার দাবি। এ ছাড়া কামরুল গত বছর এলাকায় ৫৫ লাখ টাকা দিয়ে কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন বলে তিনি জানান।
দিঘিরজান কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক এবং জামায়াতের নাজিরপুর থানা আমির আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘পিরোজপুরের সাবেক মন্ত্রীর ভাই বাবুলের অর্থদাতা এই কামরুল। মন্ত্রীর ভাইয়ের সঙ্গে সখ্যের কারণে আওয়ামী লীগের আমলে কামরুল এলাকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। আওয়ামী লীগদলীয় প্রভাব খাটিয়ে কামরুল শেখ দিঘিরজান কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জমি জোর করে দখলে নিয়ে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন। ওই সময় উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নিতে চাইলেও রাজনৈতিক প্রভাবে এ বিষয়ে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।’
মাটিভাংগা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কামরুল এলাকায় অনেক জমিজমা এবং বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার এত সম্পদের উৎস কী তা আমরা জানি না। তবে তিনি দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে কামরুল কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। কামরুলের বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর। তারা এতটাই দরিদ্র ছিলেন যে অন্যের বাড়িতে জাইগির থেকে তার পড়াশোনা চালাতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এলাকায় তিনি দলীয় প্রভাব বিস্তার করে চলতেন।’
নাজিরপুর থানার ওসি মাহামুদ আল ফরিদ বলেন, ‘গত ১৬ ডিসেম্বর বানিয়ারীতে একটি ঘর পোড়ানোর মামলায় কামরুল শেখকে আটক করা হয়েছে। তিনি এখন জেলহাজতে রয়েছেন। তার বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তসাপেক্ষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’