চাঁদপুরে জাহাজে সুনিপুণভাবে ৭ খুন, নেপথ্যে কী?

চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে জাহাজে খুন হওয়া ৭ জনের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে তাদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে শহরের স্বর্ণখোলা এলাকায় অবস্থিত মর্গ থেকে জেলা প্রশাসক, নৌ পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিততে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। 

এ সময় নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য তাদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকার চেক ও নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে দুই আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ঘটনায় আক্রান্ত জাহাজের মালিক পক্ষ মাহাবুব মোর্শেদ বাদী হয়ে হাইমচর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এর আগে গত সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) হাইমচর উপজেলার মাঝিরচর এলাকায় মেঘনা নদীতে নোঙর করে রাখা এমভি আল বাখেরা নামের একটি লাইটারেজ জাহাজ থেকে পাঁচজনের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ। এ সময় মুমূর্ষু অবস্থায় আরও তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে পথিমধ্যে আরো ২ জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে একজন মুমূর্ষ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মেসার্স বৃষ্টি এন্টারপ্রাইজের মালিকানাধীন জাহাজটি মূলত চট্টগ্রামের কাপ্পো থেকে সারবোঝাই করে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ির দিকে যাচ্ছিল।

হামলার ঘটনায় নিহতরা হলেন- জাহাজের মাস্টার ফরিদপুর সদর উপজেলার জোয়াইর গ্রামের মৃত আনিছ বিশ্বাসের ছেলে মো. কিবরিয়া, তার আপন ভাগ্নে এই গ্রামের মৃত আতাউর রহমানের ছেলে জাহাজের লস্কর শেখ সবুজ, জাহাজের সুকানি নড়াইল লোহাগড়া উপজেলার পাঙ্গাচর গ্রামের মৃত মজিবুর রহমানের ছেলে আমিনুল মুন্সী, এই উপজেলার মৃত আবেদ মোল্লার ছেলে জাহাজের ইঞ্জিনচালক মো. সালাউদ্দিন, মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার চরশোমন্তপুর গ্রামের আনিছুর রহমানের ছেলে জাহাজের লস্কর মো. মাজেদুল, একই উপজেলার পলাশ বাড়িয়া গ্রামের দাউদ হোসেনের ছেলে জাহাজের লস্কর সজিবুল ইসলাম এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন মুন্সির ছেলে মো. রানা। এই ঘটনায় মুমূর্ষ অবস্থায় বেঁচে থাকা একমাত্র ব্যক্তি হলেন জুয়েল। তিনি বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ডাকাতির উদ্দেশ্যে নয়, বরং বড় ধরনের কোনও চোরাচালানের জন্য চাঁদপুরের মেঘনায় লাইটারেজ জাহাজে ৭ খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঘটনার সাথে জড়িতরা আগে থেকেই ওই জাহাজের লোকজনের সাথে পরিচিত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, হয়তো বড় ধরনের কোনও মাদকের চালান কিংবা স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

তিনি বলেন, জাহাজের প্রতিটি মানুষ তাদের প্রত্যেকের কেবিনে বিছানায় শোয়া অবস্থায় ছিলেন এবং বাইরে থেকে তাদের প্রত্যেকের রুমের দরজা বন্ধ অবস্থায় ছিল। প্রত্যেককেই মাথায় ও গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু জাহাজের কোনও মালামাল লুট করা হয়নি। চুরি কিংবা ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হলে মালামাল তো লুটপাট করা হতো। তবে তদন্ত শেষে এই হত্যাকাণ্ডের আসল উদ্দেশ্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

জাহাজের মাস্টার নিহত কিবরিয়ার ছোট ভাই আউয়াল হোসেন বলেন, গত ৩০ বছর ধরে আমার বড় ভাই এই পেশায় কাজ করে আসছেন। আমরা কখনো কারো সাথে তার দ্বন্দ্ব বা মনোমালিন্যের খবর পাইনি। তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। আমাদের জানামতে তার এত বড় শত্রু ছিল না যে তাকে হত্যা করতে পারে।

জাহাজের আরেক সদস্য নিহত মাজেদুলের বাবা আনিছুর রহমান। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে স্বজনদের নিয়ে ছুটে আসেন চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালে। ছেলের মৃত্যু শোকে পাথর আনিছুর কিছুক্ষণ পর পরই মূর্ছা যাচ্ছিলেন। কান্না জড়িত কণ্ঠে রিকশাচালক এই পিতা বলেন, অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মাজেদুল জেএসসি পরীক্ষা শেষে মাত্র ১০ দিন আগে এই জাহাজে লস্করের চাকরিতে যোগদান করে। তার তো কারও সাথে শত্রুতা ছিল না। দ্রুত ছেলের হত্যাকারীদের আটক করে সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানান তিনি।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৪ সদস্য বিশিষ্ট ও জেলা পুলিশ বিভাগের উদ্যোগে ৩ সদস্য বিশিষ্ট পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একরামুল সিদ্দিকিকে প্রধান করা হয়েছে। বাকি তিন সদস্য হলেন- চাঁদপুর নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লা আল মামুন, জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার রাসেদুজ্জামান, জেলা কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার ফজলু হক।

অপর দিকে জেলা পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) রাসেদুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত সদর সার্কেল মুকুর চাকমা এবং হাইমচর থানার ওসি মো. ইয়াছিন। আগামী ১০ কার্য দিবসের মধ্যে উভয় তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা রয়েছে।

এ ব্যাপারে চাঁদপুর নৌ অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, প্রাথমিক অবস্থায় মনে হচ্ছে এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আগে থেকেই হত্যাকারী হয়তো জাহাদের নাবিকদের সাথে ছিল। ধরণ দেখে মনে হচ্ছে রাতের খাবারের সাথে চেতনানাশক কিছু খাওয়ায়ে তাদেরকে অজ্ঞান করে এই নৃশংসতম ঘটনা ঘটানো হয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ রুমে ছিল। এবং প্রত্যেককে মাথায় ও গলায় আঘাত করে সুনিপুণভাবে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ডাকাতির ঘটনায় যে ধরনের উপসর্গ থাকে, এই ঘটনায় তেমন কিছু দেখা যায়নি। আমরা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি এটি কোন ডাকাতির ঘটনা না। জাহাজে মূল্যবান জিনিসপত্রসহ কয়েক কোটি টাকার সার ছিল। কিন্তু জাহাজ পরিদর্শন শেষে কোন কিছু খোয়া যাওয়ার ঘটনা দেখতে পাইনি।

তিনি আরো বলেন, আমরা বিভিন্ন দিককে মাথায় রেখে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আশাকরি স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটন করে দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারব।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মোহাসীন উদ্দিন বলেন, মামলাটিকে একটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে দেখছি। দ্রæত সময়ের মধ্যে যেন আসামীদের আটক করা যায় সে জন্য প্রাশাসন কাজ করে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতমত্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাছাড়া মৃতদের পরিবারের সদস্যদেরকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।