শীতকাল কীভাবে কাটায় প্রাণিকুল

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৪:৪০ এএম

শীত এলেই জড়সড় জীবন কাটায় মানুষ। নানা উপায়ে তারা শীত নিবারণ করে। কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণীরা কীভাবে পার করে শীতকাল। লিখেছেন আহসান ইসলাম

শীতকালে শীতনিদ্রায় সময় কাটায় শীতল রক্তের প্রাণীরা। মানুষকে দেখা যায় গরম বস্ত্র, হিটার ইত্যাদি দিয়ে শীত মোকাবিলা করতে। কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাণীরা কীভাবে বাঁচে। এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক। সেখানে তারা কয়েকটি প্রাণীকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে অনেক প্রাণী রয়েছে শীতে চলাচলের উপযোগী। যেমন ভারী পশমওয়ালা বাঘ, শিয়াল, ভাল্লুক। যাদের শরীরে মাংস ও চর্বির পরিমাণ বেশি তারা তীব্র তুষারপাতেও চলাচল করতে পারে। আবার পশম থাকলেও আকারে ছোট মাংস ও চর্বি কম, এমন প্রাণী বেঁচে থাকার নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করে। আর যারা ছোট আকৃতির প্রাণী তাদেরও রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক শুরুতেই জানাচ্ছে মাকড়সার কথা। তারা বলেছে, জমিতে বসবাসকারী উত্তর আমেরিকার প্রজাতি, যেমন নেকড়ে মাকড়সা শীতকালে মাটিতে বা পাতার আবর্জনার নিচে গর্ত করে থাকে। ওহাইওর সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাকড়সা বিশেষজ্ঞ জর্জ উয়েটজ বলেন, তুষার বা বরফের হিমায়িত পৃষ্ঠ এবং এর মাত্র কয়েক ইঞ্চি নিচের তাপমাত্রার পার্থক্য আশ্চর্যজনক। অনেক মাকড়সা এবং পোকামাকড় এই ‘সাবনিভিয়ান’ পরিবেশে সক্রিয় থাকে, যেখানকার তাপমাত্রা কখনো কখনো হিমাঙ্কের কয়েক ডিগ্রি ওপরে থাকে। যেহেতু মাকড়সা ‘ইক্টোথার্ম’ অর্থাৎ বাহ্যিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করে তাদের শরীরের তাপমাত্রা। তারা শীতল রক্তের প্রাণীর মতো। অর্থাৎ তাদের শরীরের কোনো তাপ উৎপন্ন করে না। তাই তাপমাত্রা কমে গেলে তাদের বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। অথচ উষ্ণ দিনে শুধু মাকড়সা নয়, বরং অনেক পোকামাকড়কে দেখা যায় যে তারা সক্রিয়। গবেষকরা আরও বলেছেন, অনেক মাকড়সা শীতকালে তাদের ডিমকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য একাধিক স্তরের জাল দিয়ে নিরোধক তৈরি করে। যা দেখতে ডিমের থলির মতো। সেখানে তারা ডিম রাখে। আবার কালো-হলুদ মাকড়সা শরৎকালে তাদের ডিম ফোটায়। যাতে শীতকালের পুরোটা সময় ডিমের ভেতর তাদের বাচ্চারা উষ্ণ পরিবেশে থাকতে পারে। আবার কিছু মাকড়সারও একটি গোপন অস্ত্র থাকে। তারা শীতল  রাতে বিশেষ ‘অ্যান্টিফ্রিজ’ সদৃশ যৌগ তৈরি করে, যা তাদের শরীরের ভেতরে বরফের স্ফটিক তৈরি করতে বাধা দেয়।

কচ্ছপ

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কচ্ছপ যেকোনো ঋতুতে ধীরগতিতে চলে। তবে যখন শীত আসে, তখন তারা আরও ধীর হয়ে যায়, নিজেদের কার্যকলাপ আরও কমিয়ে দেয়। কিছু প্রজাতি, যেমন ইস্টার্ন বক্স কচ্ছপ শীতের পুরোটা সময় কেবল মাটিতে বসে থাকে। এ সময় তারা নিজেদের খোসার ভেতর আশ্রয় নেয়। যা অনেকটা শীতনিদ্রার মতো। এই গোটা শীতকালে এসব কচ্ছপ নিজের চর্বি পুড়িয়ে বেঁচে থাকে। অন্যান্য কচ্ছপ শীতকাল জলের তলায় নিমজ্জিত অবস্থায় কাটায়। যা পানির উপরিতলে সৃষ্ট বরফ থেকে তাদের রক্ষা করে। অনেকটা মাকড়সার মতো এসব কচ্ছপ ‘ইক্টোথার্ম’।  যাদের শরীরের তাপমাত্রা বরফের নিচে থাকা তুলনামূলক উষ্ণ পানির স্পর্শ পেয়ে উষ্ণ থাকে। এই সরীসৃপ সাধারণত বাতাসে শ্বাস নেয়। তবে শীতকালে তারা পানি থেকেই অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং পানিতেই কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করতে পারে। অন্টারিওর লরেন্টিয়ান ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী জ্যাকি লিটজগাস বলেছেন, যখন ইক্টোথার্মগুলো ঠা-া থাকে, তখন তাদের বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না, তাই তারা পানির ভেতরে থেকে যে অক্সিজেন নিতে পারে, তা শীতকালে তাদের পেতে যথেষ্ট। কচ্ছপ ত্বকের পৃষ্ঠ, মুখের অভ্যন্তর এবং বিশেষায়িত রক্তনালির মাধ্যমে গ্যাসের আদান-প্রদান করতে পারে।

মৌমাছি

তাপমাত্রা কমে গেলে ইউরোপীয় মৌমাছিরা তাদের মৌচাকে নিয়ে যায়, যেখানে তারা একসঙ্গে গুচ্ছবদ্ধ হয়ে থাকে। দীর্ঘ শীতের মাস ওই চাকের ভেতর পার করে দেয়। কর্নেল ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী এবং ‘পাইপিং হট বিজ অ্যান্ড বয়েস্টারাস বাজ-রানারস ২০ মিস্ট্রি অব হানি বি বিহেভিয়ার সলভড’র লেখক টমাস সিলি বলেছেন, এটি অনন্য, অন্য কোনো পোকা নেই, যারা শীতকালে এভাবে একসঙ্গে নিজেকে উষ্ণ রাখে। শীতে কর্মী মৌমাছিরা রানীর চারপাশে জড়ো হয়। তারা তাপমাত্রার ওঠা-নামা নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্লাস্টারের গঠন নিয়ন্ত্রণ করে। মৌমাছিরা উড্ডয়নের সময় ডানা নাড়াতে ব্যবহৃত পেশির দুটি সেটকে আইসোমেট্রিকভাবে সংকুচিত করে এবং শিথিল করে তাপ উৎপন্ন করে। ঝাঁকের কেন্দ্রে রানীর স্থানটি সবচেয়ে উষ্ণ এবং সবচেয়ে আরামদায়ক। তবে বাইরের দিকের মৌমাছিও শীত অনুভব করে না। বাতাস ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ভেতরের দিকে চাপ দেয়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করে এবং যে জায়গাটিকে অবশ্যই উষ্ণ রাখার জন্য সংকুচিত অবস্থায় থাকে। সেই পুরু বাইরের স্তরের মৌমাছিরা প্রায় ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে তাপমাত্রা ধরে রাখার লক্ষ্য রাখে। যা শীতে তাদের বাঁচিয়ে রাখে। ফুল-সমৃদ্ধ গ্রীষ্ম মৌসুমে মৌমাছিরা একটি মৌচাকে ৯০ পাউন্ড মধু উৎপাদন করে এবং শীতকালের জন্য সঞ্চয় করে। এ ছাড়া তারা এমন জায়গায় চাক তৈরি করে, যা একটি ফাঁপা গাছের গহ্বরের একেবারে শীর্ষে অবস্থান করে।

পাখি ও অন্যান্য

চিপমাঙ্ক কাঠবিড়ালি পরিবারের সদস্য। প্রায় সমস্ত শীতকালে তাদের দেখা পাওয়া যায় না। এই ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা তাদের তৈরি করা বিস্তৃত গর্ত, টানেল এবং চেম্বার সিস্টেমে আড্ডা দেয়। সেই ছোট গর্তগুলো বাদাম, বীজ এবং অন্যান্য সঞ্চিত খাবারে পূর্ণ থাকে। ইস্টার্ন চিপমাঙ্কগুলো ঘুমন্ত অবস্থায় দিন কাটায়। এ সময় তাদের হৃদস্পন্দন প্রায় ৩৫০টি থেকে মিনিটে একক অঙ্কে নেমে যায় এবং তাদের শরীরের তাপমাত্রা ৯৪ ডিগ্রি  ফারেনহাইট থেকে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তাপমাত্রায় নেমে আসে। কিন্তু তারা প্রতি কয়েক দিন পরপরই ঘুম থেকে উঠে নির্দিষ্ট পরিমাণে খায় ও প্রাকৃতিক কর্ম সারে। আর ন্যাশনাল অডুবোন সোসাইটির মাইগ্রেটরি বার্ড ইনিশিয়েটিভের পরিচালক জিল ডেপ্পের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার বাড়ির পেছনের দিকের উঠানের ৭০ শতাংশেরও বেশি পাখি পরিযায়ী। তাই তারা অগত্যা জানে না যে, সেই পাখিগুলো কোথায় গেল। লোকেরা লক্ষ্য করে যে, শরৎকালে তাদের বাড়ির উঠানগুলো শান্ত হয়ে যায়। গবেষকরা দেখেছেন, রুবি গলাযুক্ত হামিংবার্ডের ওজন এক পয়সার সমান, তবু মধ্য আমেরিকায় যাওয়ার পথে এসব পাখিদের কিছু অংশ মেক্সিকো উপসাগরে ৫০০ মাইল অতিক্রম করে একদিনে। তারা এত হালকা, মনে হয় তারা কেবল বাতাসে চড়তে পারে। গবেষকরা বলেন, কিছু পাখি এমন জায়গায় যায়, যা আপনি তাদের আশা করতে পারবেন না। অনেক পাখি আছে যেগুলো আসলে পূর্ব দিকে যায়, তাই তাদের লুইসিয়ানা বা ফ্লোরিডার বাড়ির পেছনের উঠানে শীতকালে খুঁজে পাওয়া যায়। গবেষণায় জানা গেছে, অভিবাসনে ইচ্ছুক পাখি তাদের যাত্রার জন্য বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। রাতে তারা খুব ধীরে ওড়ে যেন খাবার হজম ধীরে হয় এবং শক্তি সঞ্চিত থাকে। গবেষকরা বলছেন, তাদের ফলাফলে অনেক চমক ছিল। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সাধারণ ব্ল্যাকবার্ড গ্রীষ্মকাল দক্ষিণ জার্মানির বনে কাটায়। বেশিরভাগ পাখি শীতের জন্য সেখানেই অপেক্ষায় থাকে। তবে তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অক্টোবর এবং নভেম্বরে দক্ষিণে উড়ে যায়। এই অভিবাসীরা শীতকাল দক্ষিণ ইউরোপ বা উত্তর আফ্রিকায় কাটায়। এপ্রিলের প্রথম দিকে তারা আবার জার্মানিতে ফিরে আসে। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের পক্ষে ছোট ও বুনো পরিযায়ী পাখিদের পর্যবেক্ষণ করা, তাদের শক্তির খরচ হলো কতটা তা জানা ছিল কঠিন। তবে সম্প্রতি ক্ষুদ্র একটি যন্ত্র বা ‘ডেটা লগার’ একে সম্ভব করে তোলে। এটি পাখির শরীরে পরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ওই পাখিকে ‘ফিটনেস স্মার্টওয়াচ’ পরা বলে মনে হয়। এই ‘স্মার্টওয়াচ’ বা যন্ত্রটি পাখির শরীরের তাপমাত্রা মাপতে পারে। যন্ত্রগুলো সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রায় নয় মাস প্রতি ৩০ মিনিটে প্রতিটি পাখির শরীরের তাপমাত্রা এবং হৃৎস্পন্দন রেকর্ড করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হৃৎস্পন্দন শক্তি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। একটি পাখি যত বেশি শক্তি ব্যবহার করবে, তার হৃৎস্পন্দন তত বেশি হয়। শীতে পাখিদের হৃদস্পন্দন কম হয় মানে তারা শীতে কম শ্রম করে।

ভয়াবহ সাইক্লোন মোকাবিলা করে কীভাবে টিকে থাকে প্রাণীরা, তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০১৯ সালের মে মাসে সাইক্লোন ইদাই মোজাম্বিকের জাতীয় উদ্যানে আঘাত হানার পর সেখানকার স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ওপর কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তা নিয়ে গবেষণা হয়। মোজাম্বিকের ওই জাতীয় উদ্যানের নাম গোরোনগোসা। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধার জন্য এটি বেশ বিখ্যাত। ক্যামেরা, জিপিএস স্থাপনের বিস্তৃত নেটওয়ার্কে সজ্জিত ছিল। গবেষকরা জানাচ্ছেন, এটি প্রথম গবেষণা, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের প্রতিক্রিয়া কী হয় তা দেখতে তারা সক্ষম হয়েছেন। এসব প্রাণীর বেঁচে থাকার কৌশল ছিল বিচিত্র। যেমন বুশবাকস (হরিণের মতো একটি প্রাণী)। তারা জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রাকৃতিক টিলাগুলোকে দ্বীপ হিসেবে ব্যবহার করেছে। জিপিএস ডেটা দেখাচ্ছে যে, তারা প্রাণপণে এ রকম ঢিবির খোঁজে ছোটাছুটি করছিল। একই সঙ্গে এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান যে, প্রাকৃতিক ভূমিপূর অক্ষুণœ থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণীরা সেগুলো আশ্রয় করে বেঁচে থাকতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত