মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছনায় ক্ষোভ জানিয়ে ৩০ নাগরিকের বিবৃতি

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৩০ বিশিষ্ট নাগরিক। এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী সরকার এবং সব রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা গণমাধ্যমে এ বিবৃতি পাঠান।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেন আনু মুহাম্মদ, সুলতানা কামাল, খুশী কবির, ইফতেখারুজ্জামান, গীতি আরা নাসরীন, ফিরদৌস আজীম, জেড আই খান পান্না, পারভীন হাসান, শিরীন পারভীন হক, জোবায়দা নাসরিন, রোবায়েত ফেরদৌস, তবারক হোসাইন, সুব্রত চৌধুরী, শামসুল হুদা, শহিদুল আলম, ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান, সায়দিয়া গুলরুখ, রেহনুমা আহমেদ, তাসনিম সিরাজ মাহাবুব, ফসটিনা পেরেইরা, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, মনীন্দ্র কুমার নাথ, পাভেল পার্থ, মিনহাজুল হক চৌধুরী, আশরাফ আলী, শাহাদাত আলম, নাজমুল হুদা, হানা শামস আহমেদ ও সাঈদ নাসের বখতিয়ার আহমেদ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জেনেছি যে, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানু ২২ ডিসেম্বর, রবিবার দুপুরে ওষুধ কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, এ সময় স্থানীয় জামায়াতকর্মী আবুল হাসেমের নেতৃত্বে ১০-১২ জন তাকে ধরে জুতার মালা পরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে তাকে দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ারও নির্দেশ দেয় তারা। ওই ঘটনায় উপস্থিত জড়িত আরও কয়েকজন হলো কুলিয়ারা গ্রামের আবুল হাশেম, অহিদুর রহমান, পেয়ার আহমেদ, রাসেল, শহীদ, এমরান হোসেন, ফরহান হোসেন, কামরান হোসেন। শুধু জুতার মালা পরিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি, তা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। সংগত কারণেই তিনি প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছেন এবং তার নিরাপত্তাও বিপন্ন। তাই তিনি এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।’

বিবৃতিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় লেখক, অধ্যাপক, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার এ ব্যক্তিরা বলেছেন, ‘আমরা এহেন ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর উপযুক্ত ভাষা জানি না। প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি আমরা ইতিমধ্যে শনাক্ত করা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। আমরা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই, ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা রাজনৈতিক আক্রোশ কারণ যা-ই হোক, এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। অন্তর্বর্তী সরকার, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এর বিরুদ্ধে দুর্জয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সদা সক্রিয় থাকতে হবে।’

কুমিল্লার এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে। এতে বলা হয়েছে, মনে রাখতে হবে, গত ১৬ বছরের কর্র্তৃত্ববাদী সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দলীয়করণের মাধ্যমে যেভাবে পদদলিত করেছে, তার দায় পতিত সরকারের প্রধান ও তার সহযোগীদের। তাই বলে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কোনো প্রকার অসম্মান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অন্তর্বর্তী সরকার, সব রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি এ ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বিবৃতিদাতারা। তারা বলেছেন, ‘এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুজনকে জামায়াতের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। আমরা মনে করি, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্বীকৃতি ও সম্মান বিষয়ে জামায়াতের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও তার বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের প্রকাশ্য ঘোষণা যেমন অপরিহার্য, সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালে তাদের অবস্থানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা বাঞ্ছনীয়।’

লাঞ্ছনায় জড়িত অভিযোগে আটক ৫ : মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই কানুকে লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে তাদের আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে জুতার মালা পরানোর পর মুক্তিযোদ্ধাকে টানাহেঁচড়া করা প্রধান দুই অভিযুক্ত (বহিষ্কৃত জামায়াত সমর্থক) এখনো ধরা পড়েননি। গতকাল বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিং করে চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি এটিএম আক্তার উজ জামান পাঁচজনকে আটকের বিষয়টি জানান। লাঞ্ছনার এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে মামলা করার জন্য এজাহার তৈরি করে নিয়ে আসার সময় দুর্বৃত্তরা ছিনিয়ে নিয়েছে বলে লাঞ্ছনার শিকার ওই মুক্তিযোদ্ধা অভিযোগ করেছেন।

আটক পাঁচজন হলো চৌদ্দগ্রামের বাতিসা ইউনিয়নের কুলিয়ারা গ্রামের ইসমাইল হোসেন মজুমদার (৪৩), মো. জামাল উদ্দিন মজুমদার (৫৮), ইলিয়াছ ভূঁইয়া (৫৮), স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও পাশের নাঙ্গলকোট উপজেলার রায়কোট গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৪৮) এবং চাঁদপুর সদরের মইশাদী গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ইমতিয়াজ আবদুল্লাহ সাজ্জাদ (১৯)। ইমতিয়াজ প্রধান অভিযুক্ত আবুল হাশেমের ভাগ্নে।

ব্রিফিংয়ে ওসি আক্তার উজ জামান জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে তারা অনুসন্ধান শুরু করেন। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয় এবং ভিডিও ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আটক করার জন্য অভিযান চালানো হয়। তাদের মধ্যে সোমবার রাতভর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে আটক করা হয়।

গত রবিবার দুপুরে চৌদ্দগ্রামের বাতিসা ইউনিয়নের কুলিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাইকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে রাতে এ ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন ফেনী এবং কুমিল্লা প্রতিনিধি