বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগরীর নগরায়ণের চিত্র। একসময় নগরীর আগ্রাবাদ—চৌমুহনী এলাকায় বহুতল ভবনের সংখ্যা বেশি থাকলেও এখন সেখানে বদলের হাওয়া। বর্তমানে চকবাজার, জামালখান, শুলকবহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁওসহ নগরের উত্তর-পূর্ব দিকের এলাকায় বাড়ছে বহুতল ভবন। নতুন এই পরিবর্তনে পরিকল্পনাবিদরা অবাক হলেও ডেভেলপারদের মতে এটাই স্বাভাবিক।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের আওতায় নগরীর ভবনগুলোর উপর সার্ভে করে। সম্প্রতি শেষ হওয়া সেই সার্ভেতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরীরর ৪১টি ওয়ার্ডে মোট ৪ লাখ ১ হাজার ৭২১টি ভবন রয়েছে। এসব ভবনের মধ্যে এক থেকে ছয়তলা পর্যন্ত ভবন রয়েছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৭টি। ৭ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবন রয়েছে ১৩ হাজার ৪৮০, ১১ থেকে ১৫ তলার রয়েছে ৪১৫, ১৬ থেকে ২০ তলার রয়েছে ৫০ ও ২০ তলার অধিক উচ্চতার ভবন রয়েছে ৯টি।
সার্ভে থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে কম উচ্চতার (এক থেকে ছয় তলা) ভবনের শীর্ষে রয়েছে চান্দগাঁও ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডে ২১ হাজার ৫০টি বাড়ি রয়েছে। আর পরেই রয়েছে নগরীর ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ড (২১ হাজার ২৬টি)। এছাড়া ৪০ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর পতেঙ্গায় ১৫ হাজার ৯৭৮,৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ডে ১৪ হাজার ৭৩৬, ৯ নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ১৭ হাজার ৪৫৫ ও ১৩ নং পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ১৪ হাজার ৩০৬টি ভবন রয়েছে।
৭ থেকে ১০ তলা এই উচ্চতার ভবনগুলো আবাসিক ভবনের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই উচ্চতার ভবন রয়েছ ১৩ হাজার ৪৮০টি। যারমধ্যে ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ডে ১ হাজার ১৩৭টি। জালালাবাদে ৭৩৫টি, চাঁন্দগাওতে ৭৬৬টি, দক্ষিণ পতেঙ্গায় ৫৬৬টি, পশ্চিম বাকলিয়ায় ৫০৬টি, চকবাজারে ৪৪৮টি ও বাগমনিরামে ৪১৩টি। তবে ১১ থেকে ১৫ তলার ভবন রয়েছে ৪১৫টি। এসব ভবনের মধ্যে শুলকবহরেই ৬৮টি, চকবাজারে ৫৮টি, বাগমনিরামে ৪২টি, জামালখানে ৩৭ টি। নগরীতে ১৬ থেকে ২০ তলার ৫০টি ভবন রয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক হাব দক্ষিণ আগ্রাবাদে ১১টি, শুলকবহরেই ৮টি, চকবাজারে ৭টি, জামালখানে ৬টি ও পাঠানটুলি ওয়ার্ডে ৪টি। ২০ তলার অধিক উচ্চতার ভবন রয়েছে ৯টি। যার মধ্যে তিনটি পাঠানটুলী ওয়ার্ডে এবং একটি করে রয়েছে চান্দগাঁও, সরাইপাড়া, লালখানবাজার, বাগমনিরাম, জামালখান ও গোসাইলডাঙ্গায়। তবে সবচেয়ে বেশি উচ্চতার ভবন আগ্রাবাদ এলাকার আজিজ কোর্ট, ৩২ তলা উচ্চতা।
সার্ভে সম্পর্কে জানতে চাইলে সিডিএর উপ—প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের পরিচালক আবু ঈসা আনসারী বলের,‘ আমরা চট্টগ্রাম মহানগরীর সকল ভবনের উপাত্ত ড্রোন সার্ভের সাথে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্ধারণ করেছি। শুধু তাই নয় আমরা পুরো নগরীর থ্রিডি (ত্রিমাত্রিক) ম্যাপও তৈরি করেছি এই সার্ভের মাধ্যমে। এখন আমরা কোন উচ্চতার ভবন কোথায় রয়েছে তা সহজেই বের করতে পারি। কোন এলাকায় কতো উচ্চতার ভবন কতোটি আছে তা কম্পিউটারের এক বাটন ক্লিকেই বের করা সম্ভব। এতে নগরীর সম্প্রসারণ কোন দিকে হচ্ছে তা জানা যাবে এবং সেই অনুযায়ীয় পরিকল্পনা নেয়া যাবে।’
ভবনের গতিপথে বদল কেন
বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও সিডিএর বোর্ড সদস্য স্থপতি জেরিনা হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরে ভবন নির্মাণে নতুন এই তথ্য অবশ্যই নতুন ধারা। একসময় নগরায়নের ধারা ছিল আগ্রাাবাদমুখী। এখন তা উত্তর—পূর্ব দিকে গতি পাচ্ছে বলে দেখা যাচেছ।’
কিন্তু উত্তর—পূর্ব দিকে কেন বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়ছে তা জানতে চাইলে চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে আবাসন শিল্পের সাথে জড়িত ফিনলে প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আই খসরু বলেন, ‘মানুষ নাগরিক সুযোগ সুবিধা যেদিকে পাবে সেদিকেই বাড়ি নির্মাণ করবে। নগরীর উত্তর—পূর্ব দিকের এলাকাগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্টান, হাসপাতাল, শপিংমলসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধা বেশি রয়েছে। তাই এসব এলাকায় সুউচ্চ ভবন গড়ে উঠছে। এছাড়া গ্রাহকের চাহিদা বেশি থাকায় ডেভেলপাররাও এসব এলাকায় প্রকল্প নিয়ে দ্রুত ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারে।’
এম আই খসরুর সাথে একমত পোষণ করেন কলেজ শিক্ষক ফয়জুল কবির। তিনি নিজেও অনেকের সাথে গ্রুপে নগরীর চকবাজার এলাকায় জায়গা কিনে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। তিনি বলেন, ছেলে—মেয়েদের জন্য স্কুল ও কলেজ এখানে খুব কাছে। যথারীতি এই এলাকায় ভূমির দাম বেশি হলেও এখানেই স্বাচ্ছন্দ্য।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, নগরীর অন্যান্য এলাকায় খালি জায়গা তেমন নেই। নগরীর প্রান্তীয় এলাকাগুলোতে খালি জায়গা রয়েছে এবং সেসব এলাকায় নতুন নতুন ভবন গড়ে উঠছে। আর নতুন ভবনগুলো সবগুলোই ১০ তলার বেশি উচ্চতার। একসময় একক পরিবার চার থেকে পাঁচ তলা ভবনের ভবন নির্মাণ করতো। এখন একসাথে অনেকজন মিলে ভবন নির্মাণ করে বলে বেশিরভাগ ভবনই ১০ তলার বেশি হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে নতুন ভবন এবং ডেভেলপারার যেসব ভবন নির্মাণ করেন সেগুলোও ১০ তলার বেশি। তাই নগরীর জামালখান, চকবাজার, শুলকবহর, চান্দগাঁও প্রভৃতি এলাকায় বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়ছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কদমতলী থেকে সরকারি কমার্স কলেজ, মাদারবাড়ি থেকে কমার্স কলেজ এই এলাকায় যাতায়াতের জন্য একটি চওড়া রোড নেই। একটি চওড়া রোড থাকলে নগরীর কেন্দ্রস্থলের এলাকাটিতে আরো বহুতল ভবন গড়ে উঠতে পারতো বলে স্থানীয়দের অভিমত। শুধু এই এলাকা নয়, নগরীর চৌমুহনী এলাকার মিস্ত্রী পাড়া, পানওয়ালা পাড়া, হাজী পাড়া, মুন্সী পাড়া, ঈদগাহ, বউ বাজার, শান্তিবাগ ও রামপুরের মধ্যবতীর্ বিশাল এলাকাটির মধ্যে কোনো চওড়া রোড নেই। এতে এসব এলাকায় বহুতল ভবন যেমন গড়ে উঠছে না তেমনিভাবে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহারও হচ্ছে না। এধরনের সংযোগ রোডের অভাবে নগরীর অনেক কেন্দ্রস্থল এলাকার পাশে খালি জায়গা কিংবা সেমিপাকা ঘর রয়ে গেছে। যেকোনো পরিকল্পিত ডেভেলপমেন্টের জন্য রোড নেটওয়ার্ক একটি বড় ফ্যাক্টর।
উল্লেখ্য, মধ্যম হালিশহর, উত্তর মধ্যম হালিশহর ও দক্ষিণ মধ্যম হালিশহরের অনেক এলাকা এখনো শুধু রোড নেটওয়ার্কের অভাবে প্রসারলাভ করতে পারছে না। অক্সিজেন মোড় ও কাপ্তাই রাস্তার মধ্যে সিডিএ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সড়ক নির্মাণের কারণে এখন এর উভয় পাশে গড়ে উঠছে অনন্যা আবাসিক এলাকা। দেওয়ানহাট থেকে অলংকার পর্যন্ত ডিটি রোড সম্প্রসারণের কারণে পাহাড়তলী এলাকায় উন্নয়ন হচ্ছে। সিরাজুদ্দৌল্লা রোড সম্প্রসারণের কারণে উভয় পাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন এবং এলাকার মানুষ সুফল পাচ্ছে। একইভাবে বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত ব্রিজ পর্যন্ত রোডটি সম্প্রসারণ হওয়ায় কল্পলোক আবাসিক এলাকায় অনেক ভবন গড়ে উঠেছে।