ছাত্রদলের কমিটিতে ছাত্রলীগ, বিবাহিত ও অছাত্ররা!

ছাত্রলীগ কর্মী, অছাত্র ও বিবাহিতদের পদে রেখে ঢাকা মহানগরসহ রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কয়েকটি কলেজ মিলিয়ে ১১টি ইউনিটে ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এমন অভিযোগে গত মঙ্গলবার কমিটি ঘোষণার পর থেকেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ ও ঢাকা পলিটেকনিকসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছেন নিজেদের পদবঞ্চিত ও ত্যাগী দাবি করা নেতাকর্মীরা। গতকাল বুধবারও ককটেল ফাটিয়ে, টায়ারে আগুন লাগিয়ে নিজ নিজ ক্যাম্পাসের ভেতর বিক্ষোভ ও সামনের সড়ক অবরোধ করতে দেখা গেছে তাদের। এ সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়। এতে ওই এলাকাগুলোয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

গত মঙ্গলবার কমিটি ঘোষণার পর থেকেই ‘পদবঞ্চিত’দের মহড়ায় উত্তপ্ত ছিল ঢাকা কলেজ। সেদিন রাতেই কয়েক দফা ককটেল বিস্ফোরণে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় ওই এলাকায়। এরপর গতকাল বেলা ১১টা থেকে ক্যাম্পাসের বিজয় চত্বরের সামনে জড়ো হন ‘পদবঞ্চিতরা’। সদ্যঘোষিত কমিটি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। নতুন কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা না করা পর্যন্ত এই কমিটির সদস্যরা ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবেন না বলে জানান বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। সারা দিন অবস্থান কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কলেজের সামনে মিরপুর সড়ক অবরোধ করেন তারা। ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে ছাত্রলীগের কর্মীরা পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন নিজেকে পদবঞ্চিত দাবি করা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে যে কমিটি হয়েছিল সেখানে সদস্য ছিলাম এবং তার পরের কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। গত ২৮ অক্টোবরের পর জীবন বাজি রেখে রাজপথে ছিলাম। রাজপথে থাকার পর দলীয় যে নির্দেশনা দিয়েছে সব যথাযথভাবে পালন করেছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তারেক রহমানের নির্দেশে সাধারণ ছাত্রদের পাশে থেকে আমরা সায়েন্সল্যাব, ঝিগাতলা ও ঢাকা কলেজ এলাকায় আন্দোলন চালিয়ে যাই। আর এখন দলের একটি খারাপ চক্রদের নিয়ে গতকাল (মঙ্গলবার) একটি কমিটি হয়েছে। ৩৬ জনের এ কমিটিতে চার-পাঁচজন ছাত্রলীগের কর্মীও আছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ঢাকা কলেজের প্রধান ফটকের সামনে দুটি, নায়েমের গলি ও মিরপুর রোডে চারটি এবং ঢাকা কলেজের উল্টো দিকের ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে কেউ হতাহত না হলেও লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শীর্ষ পদপ্রত্যাশী তারেক বলেন, ‘৫ আগস্টের পর নতুন অনেকেই রাজনীতি করছেন। অনেক ত্যাগীকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা এসব নিয়ে বিক্ষোভ করেছি। বিক্ষোভ শেষে দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। একটি মোটরসাইকেল নিয়ে তারা পালিয়ে যায়, তাদের ধাওয়া দিয়েও ধরতে পারিনি।’

এ বিষয়ে ঢাকা কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নিউ মার্কেট থানাকে জানানো হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহসেন উদ্দীন বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ বিষয়টি নজরে রাখছে।’

জবির সক্রিয় দুই ব্যাচকে উপেক্ষা করে কমিটি : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ৯ম এবং ১১তম ব্যাচের নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে নতুন কমিটি ঘোষণার অভিযোগ উঠেছে। এই কমিটি প্রত্যাখান করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ‘পদবঞ্চিত’ নেতাকর্মীরা। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে শতাধিক নেতাকর্মী জড়ো হয়ে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তারা অছাত্র, অনিয়মিত ও ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। অবিলম্বে এই কমিটি বাতিলের দাবি জানান তারা। তারা নতুন কমিটি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। জবি ছাত্রদলের সাবেক সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুস শুকুর আইমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে। এই কমিটিতে বিগত দিনে যারা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকেছে, তাদের বাদ দিয়ে নিজস্ব মাই ম্যান সেটাপ করতে সিন্ডিকেট করে পকেট কমিটি গঠন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সক্রিয় ৯ম এবং ১১ ব্যাচের কাউকে কমিটিতে রাখা হয়নি। অথচ ছাত্রলীগ থেকে ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলে যোগ দেওয়া ছেলেদের কমিটিতে রাখা হয়েছে। সুতরাং এই কমিটি আমরা ৪৫ দিন নয়, একদিনও মানি না।’

কবি নজরুল কলেজে বিক্ষোভ : সংগঠনের কর্মসূচিতে অনিয়মিত এবং দলের দুঃসময়ে না থাকারা কবি নজরুল সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে পদ পেয়েছেন অভিযোগে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষুব্ধ ‘পদবঞ্চিত’ নেতাকর্মীরা বলেন, নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া অনেককেই চেনেন না সদ্য সাবেক কমিটির সভাপতিসহ শীর্ষ নেতারা। এই কমিটি দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় সংসদ শাখার নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি বলে অভিযোগ করেছেন সদ্য সাবেক সভাপতি মো. সাইয়্যেদুর রহমান সাঈদ। তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে যতগুলো কমিটি গঠন করা হয়েছে প্রত্যেকটি কমিটি গঠন করার আগে সভাপতি-সেক্রেটারিদের সঙ্গে কিছুটা হলেও আলাপ-আলোচনা করেছে। কিন্তু এবার আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা না করেই আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। আমার নিজের কোনো প্রার্থী ছিল না। তবে যারা নিয়মিত প্রোগাম করেছে তাদের ত্যাগকে যেন অবমূল্যায়ন না করা হয় সেজন্য আমরা যোগাযোগ করতে গিয়েও যোগাযোগ করতে পারিনি। যাকে এখানে আহ্বায়ক করা হয়েছে সে আমাদের ৩৮টি মিছিলের মধ্যে মাত্র আটটি এবং সদস্য সচিব তিন মিছিলে অংশগ্রহণ করেছে। এ ছাড়া কমিটিতে এমন কিছু নাম দেখতে পেয়েছি, তাদের আমি নিজেই চিনি না এবং আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, তারাও নাকি চেনে না তাদের।’

বাংলা কলেজে বিবাহিত, মাদকাসক্ত ও অছাত্ররা : বিবাহিত, অছাত্র ও মাদকাসক্তদের নিয়ে রাজধানীর সরকারি বাঙলা কলেজে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার অভিযোগ তুলেছেন ‘পদবঞ্চিতরা’। নতুন কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তারা ক্যাম্পাসের ভেতরে-বাইরে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন তারা। বাঙলা কলেজের ‘পদবঞ্চিত’ এক ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আমাদের অনেকেই আহত হয়েছেন, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং মিরপুরে সম্মুখ সারিতে থেকে জীবন বাজি রেখে কর্মীদের নিয়ে সর্বোচ্চ সংগ্রাম করেছি। অথচ তাদের বাদ দিয়ে বাঙলা কলেজের ছাত্র না এবং অবিবাহিত ও মাদকাসক্তদের দিয়ে টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

তিতুমীর কলেজে বিক্ষোভ, বিস্ফোরণ : কমিটি ঘোষণার পর থেকেই উত্তাল ছিল তিতুমীর কলেজ। গতকাল সকালে ক্যাম্পাসের মূল ফটক থেকে মিছিল বের করেন ‘পদবঞ্চিত’ নেতাকর্মীরা। মিছিলটি ওয়্যারলেস টিবিগেট ঘুরে একই পথে ক্যাম্পাসের সামনে এসে শেষ হয়। পরে কলেজের মূল ফটকে টায়ার জ¦ালিয়ে বিক্ষোভ এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যদিও এ বিস্ফোরণে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সেখানে কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিরাজ আল ওয়াসী বলেন, ‘নতুন কমিটিতে গুম, খুন, হামলা ও মামলার শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রদল এই কমিটিকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং প্রতিহত করতে প্রস্তুত রয়েছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করে কমিটি বর্ধিত না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’

এ ছাড়া রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ ঢাকা মহানগরের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম ইউনিটেও নতুন কমিটি একই ধরনের অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

ককটেল বিস্ফোরণ ও টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘এ রকম কোনো কিছু আমাদের জানা নেই। তবে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করতে চায় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।