স্বদেশে ফিরতে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের গণসমাবেশ

ক্যাম্পের জীবনকে বন্দি খাঁচার পাখি বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বলেছেন, ‘মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত জীবন খুবই কষ্টের। এ জীবন থেকে মুক্তি পেতে নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। গতকাল বুধবার উখিয়ার উখিয়া কুতুপালং ১ নম্বর ইস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুষ্ঠিত এক গণসমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা এসব কথা বলেন।

ক্যাম্পের মাঠে রোহিঙ্গা যুবকদের সংগঠন ‘ইসলামি মাহাসা’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশটি চলে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। যেখানে সমবেত হয়েছিল লাখের কাছাকাছি বিভিন্ন বয়সী মানুষ। নিজের দেশে ফিরতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জোরালো ভূমিকা দাবি জানিয়েছে রোহিঙ্গারা।

সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতা ডা. মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশ মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে ফিরে যেতে প্রস্তুত। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা করলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ হবে। রোহিঙ্গাদের দাবিগুলেঅ মিয়ানমার সরকার মেনে নিলে আমরা ফিরে যাব।’

ডা. জোবায়ের তার বক্তব্যে বলেন, ‘ক্যাম্পের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে আরাকান আর্মির শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ফিরতে আরও জটিলতা তৈরি হয়েছে। আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাদের নির্যাতন ও হত্যা করে যাচ্ছে। এর আগে মিয়ানমারের জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তার সঠিক ও ন্যায় বিচার এখনো হয়নি। রোহিঙ্গা নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা দ্রুত করার জন্য জাতিসংঘসহ বিশ^ সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের দাবিগুলো নিশ্চিত করা হলে আমরা স্বেচ্ছায় মিয়ানমার চলে যাব। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে সারা জীবন থাকার জন্য আসেনি। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নিয়েছে, থাকার জন্য জমি দিয়েছে, ঘর দিয়েছে, খাবারের ব্যবস্থা করেছে। নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে। আমরা (রোহিঙ্গারা) বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের কাছে সারা জীবন ঋণী হয়ে থাকব।’

সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতা মাওলানা রাহমত করিম বলেন, ‘ক্যাম্পের এমন জরাজীর্ণ বন্দিজীবন মানুষের জন্য নয়। এখানে বাংলাদেশ যে উদারতা দেখিয়েছে, তার জন্য রোহিঙ্গারা কৃতজ্ঞ। এখন সারা বিশ্ববাসীকে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ন্যায়সংগত ফেরতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

সমাবেশে মাওলানা জহির আহমেদ, কাওয়ালি হামিদ, মাওলানা আবদুর রশিদ, মাওলানা দিল মোহাম্মদসহ অসংখ্য রোহিঙ্গা আলেম, ওলামা এবং যুবক বক্তব্য রাখেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি সিরাজ আমিন রোহিঙ্গাদের সমাবেশের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে রোহিঙ্গাদের গণসমাবেশ হয়েছে। তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে এ সমাবেশ করেছে।’

ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা নিজেদের মধ্যে হানাহানি ও বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা বন্ধসহ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে এ সমাবেশ আয়োজন করেছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের শরাণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ সমাবেশটি গত সোমবার আয়োজনের জন্য অনুমতি গ্রহণ করেছে। বুধবার শান্তিপূর্ণ সমাবেশটি শেষ হয়েছে।’

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে এবং নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে রয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর সংঘাত ও সহিংসতার জেরে আরও ৬০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে অনেক রোহিঙ্গাও।