শর্ত ভেঙে লিজ ভবন নির্মাণ

রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) মালিকানাধীন গুলশানের শহীদ তাজউদ্দীন স্মৃতি পার্ক (সাবেক গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক) ও বিচারপতি শাহাবউদ্দিন পার্ক কয়েকটি শর্তে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনসিসি কর্র্তৃপক্ষ বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গ করে পার্কটি গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কাছে লিজ দিয়েছে। ক্লাবটি পার্ক লিজ নিয়ে সেখানে ভবন, রেস্টুরেন্ট, কফিশপ নির্মাণ করেছে। ঘটনাটি জানার পর পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) পার্কের লিজ বাতিল, উদ্ধার, বেআইনি স্থাপনা অপসারণ ও নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পার্ক থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ডিএনসিসিকে চিঠি দিয়েছে রাজউক। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রাজউক থেকে পাওয়া নথিপত্রের তথ্যমতে, গুলশান আবাসিক এলাকার শহীদ তাজউদ্দীন পার্ক ও বিচারপতি শাহাবউদ্দিন পার্ক কয়েকটি শর্তে ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে হস্তান্তরের তারিখ থেকে তিন বছর পর নবায়ন করতে হবে। পার্ক, খেলার মাঠ ও উদ্যান কোনো অবস্থাতেই তৃতীয়পক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ, ভাড়া ও হস্তান্তর করা যাবে না। পার্ক, খেলার মাঠ ও উদ্যান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। পার্ক, মাঠ ও উদ্যানে কোনোরূপ স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।

রাজউকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশানের পার্ক দুটি ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তর করার পর সেগুলো গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কাছে লিজ দেয়। এর পরই ক্লাব কর্র্তৃপক্ষ শহীদ তাজউদ্দীন পার্কের ভেতরে দুটি ভবন নির্মাণ করে। এর একটি ভবন হচ্ছে একতলা, অন্যটি আংশিক দোতলা। ভবন দুটিতে ইয়ুথ ক্লাবের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। আর পার্কের ভেতরে যে দুটি মাঠ রয়েছে, সেগুলো ক্লাবের খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। পার্কের চারদিকে মানুষের হাঁটাচলার জন্য কোনো ওয়ার্কওয়ে তৈরি করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিচারপতি শাহাবউদ্দিন পার্কে একটি রেস্টুরেন্ট, একটি মিনি কপিশপ, একটি চায়ের দোকান ও একটি লাইব্রেরি নির্মাণ করা হয়েছে। পার্কের ভেতরে নির্মাণ করা স্থাপনা উচ্ছেদ করতে ২০২৩ সালের ৩০ মে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন কর্র্তৃপক্ষ কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি।

অভিযোগ আছে, পার্কে সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঘটনাটি জানার পর পরিবেশ বাঁচা আন্দোলন (পবা) পার্কের লিজ বাতিল, উদ্ধার, বেআইনি স্থাপনা অপসারণ ও নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজউক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশনার ওপর ভিত্তিতে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে গত ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাজউকের ২২তম বোর্ডসভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। রাজউক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. সিদ্দিকুর রহমান সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় আলোচনার ভিত্তিতে বরাদ্দপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে স্থাপনা নির্মাণ করায় সেগুলো সাত দিনের মধ্যে উচ্ছেদ না করলে বরাদ্দ চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজউকের (এস্টেট ও ভূমি-১) পরিচালককে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের ডিএনসিসিকে চিঠি দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) তাহমিনা পারভীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আমরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। তারা ব্যবস্থা গ্রহণের পর বিষয়টি আমাদের অবহিত করবেন। তবে এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের চিঠি দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। রাজউকের চিঠি তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুলশানের এই পার্ক একটি ক্লাবকে দেওয়ার পর তারা পার্কের ভেতরে স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। পার্কের ভেতরে মানুষের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হচ্ছে, এটি হতে পারে না। মানুষের অধিকারকে রহিত করা হচ্ছে। এ কারণে আমরা চাই মাঠ মাঠের মতো, পার্ক পার্কের মতো থাকুক।’

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই ঢাকায় মাঠের সংখ্যা কম। কোনো একটি জনপদে যখন মাঠের সংখ্যা কমে যায় অর্থাৎ খেলা, শরীরচর্চা ও বিনোদনের জায়গা কমে যায়, তখন মানুষের স্বাস্থ্যের ও মানসিকতার ক্ষতি হয় এবং অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য রাখতে হলে মাঠের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যেসব মাঠ আছে সেগুলোকে রক্ষা করতে হবে এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এ ভাবনা থেকে আমরা মাঠগুলো নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার মধ্যে গুলশানের এই পার্ক প্রথম।’

পবার সাধারণ সম্পাদক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ সুমন জানান, রাজউকের মাস্টার প্ল্যানে গুলশানের শহীদ তাজউদ্দীন পার্কটি সাধারণ মানুষের শরীরচর্চা ও বিনোদনের জন্য চিহ্নিত করা আছে। মাঠ, পার্ক, জলাধার আইন ২০০০ এর ৫ ধারা অনুযায়ী মাঠ, পার্ক, জলাধার কোনোভাবেই ইজারা বা হস্তান্তর করা যাবে না। এ পার্ক ইতিপূর্বে একাধিকবার বরাদ্দ প্রদান করা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে মামলা হয়েছে।

তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে মেসার্স ভায়া মিডিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান গুলশানের ১০৩/১০৯ নম্বর রোড-সংলগ্ন ৩ দশমিক ৩৩ একর আয়তনের গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের জায়গা রাজউকের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ওয়ান্ডারল্যান্ড চিলড্রেন পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু করে। কিন্তু আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে পার্ক নির্মাণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৫ সালে গুলশানের এক বাসিন্দা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। হাইকোর্টের রায়ে ওয়ান্ডারল্যান্ডের বরাদ্দ বাতিল করা হয় এবং ২০১২ সালে রাজউক পার্কটির দখল নেয়। পরে ২০১৭ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিএনসিসি পার্কটি রাজউকের কাছ থেকে বরাদ্দ নেয়। এরপর ডিএনসিসির তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক পার্কটি শিশুদের মতামত নিয়ে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেন। খেলাধুলা আর প্রাকৃতিকভাবে শিশুরা যাতে বেড়ে উঠতে পারে, এমনভাবে পার্কটির ডিজাইন করেন। তার মৃত্যুর পর ২০২২ সালের ডিসেম্বর সদ্য সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। উদ্বোধনের পর পার্কটিতে ছিল দৃষ্টিনন্দন চক্রাকার হাঁটাচলার পথ, শিশু-কিশোর, প্রতিবন্ধীদের জন্য দুটি প্লেয়িং জোনসহ ২২ ধরনের খেলনা ও বিভিন্ন দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। ছিল ঘাসে আচ্ছাদিত একটি খেলার মাঠ। সারি সারি গাছের পাশে দুটি হাঁটার পথ। পার্কের ভেতরে ছিল শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য বিশেষ রাইড।

২০২৩ সালে পার্কটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লিজ নেওয়ার পর গুলশান ইয়ুথ ক্লাব পার্কের ভেতরে থাকার উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য বিশেষ রাইড ভেঙে ফেলে। খেলার মাঠে বেড়া দেওয়া হয়। চারদিকে নির্মাণ করা হচ্ছে স্টেডিয়ামের আদলে গ্যালারি। সবুজ পার্কের মাটিতে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ফুটবল টার্ফ। মাঠ আর পার্কে শিশু-কিশোরদের আর কোনো উপস্থিতি নেই।