মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার পুরান বাউশিয়া গ্রামের শরীফ হোসেনের ছেলে বিদেশে যাবেন। ইতিমধ্যে বিদেশে যাওয়ার ভিসা পেয়ে গেছেন। এখন দরকার টাকা। অথচ হাতে নেই প্রয়োজনীয় টাকা। অগত্যা ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে ৩০ শতাংশ জমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভূমি অফিসে খাজনা দিতে পারছেন না তিনি। ফলে বিক্রি করতে পারছেন না জমিও। এদিকে ছেলের ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে বিধায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাবা শরীফ হোসেন। ভূমি সেবার মানোন্নয়নে পরীক্ষামূলক নতুন সফটওয়্যার চালু হলেও জটিলতা ও ত্রুটির থাকায় এমনই ভোগান্তিতে পড়েছেন মুন্সীগঞ্জের মানুষ।
শরীফ হোসেনের মতোই একই উপজেলার হোগলাকান্দি গ্রামের আরিফ হোসেনও তার জমি বিক্রি করতে পারছেন না। আরিফ হোসেন বলেন, ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে জমির খাজনা কাটতে পারছেন না। ফলে জমিও বিক্রি করতে পারছেন না।
শরীফ ও আরিফের মতোই মুন্সীগঞ্জ সদরসহ অন্যান্য উপজেলার অনেকেই জমির খাজনা দিতে পারছেন না। কেউ কেউ করতে পারছেন না নামজারি। এতে করে এক মাস ধরে মুন্সীগঞ্জ জুড়ে জমি কেনাবেচায় ভাটা পড়েছে। দলিল লেখকদের হাতের কাজ কমে গেছে। নতুন করে কমেছে দলিল রেজিস্ট্রিও। আগের তুলনায় দলিল রেজিস্ট্রি কমে নেমে এসেছে অর্ধেকে।
জেলার সিরাজদীখান উপজেলার শেখরনগর গ্রামের ইকবাল হোসেন তার ৫ শতাংশ জমি বিক্রি করতে চেয়েও পারছেন না। এক মাস ধরে নামজারি করতে না পারায় আটকে আছে তার জমি বিক্রি। তিনি বলেন, ‘জমি বিক্রি করব। সেই জন্য নামজারি দরকার। এক মাস ধরে ভূমি অফিসে যাওয়া-আসার মধ্যেই আছি। সফটওয়্যারের সমস্যায় সার্ভার না পাওয়ায় নামজারি করতে পারছি না।’
একই উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের শিয়ালদী গ্রামের আওয়াল শেখ বলেন, ‘গত এক মাসের বেশি সময় ধরে আমি নামজারির জন্য উপজেলা ভূমি অফিসে দৌড়াচ্ছি। অফিসে এলেই সার্ভার বন্ধ থাকার কথা জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে আমার ১০ শতাংশ জমি বিক্রি করতে পারছি না।’
ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভূমিসংক্রান্ত কাজে গতি আনতে ৫টি সফটওয়্যার একত্র করে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় ৪টি সফটওয়্যারের মানোন্নয়ন এবং একটি নতুন উদ্ভাবিত সফটওয়্যার জনগণের ব্যবহারের জন্য পরীক্ষামূলক উন্মুক্ত করা হয়েছে। আর সেখানেই বেধেছে বিপত্তি। সফটওয়্যার চালু হলেও আসছে না কাজে। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা গেলেও ভূমি কার্যালয়ের অ্যাকাউন্ট লগইন করতে সমস্যা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে জেলার গজারিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে নতুন করে খাজনা আদায় কিংবা নামজারি করতে আসা সেবাগ্রহীতার দেখা মেলেনি। একই দিন উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে গিয়েও পাওয়া যায়নি সাব-রেজিস্ট্রারকে।
তবে গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা হলে গজারিয়া উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মিরাজ উদ্দিন জানান, সফটওয়্যারে সমস্যার কারণে নামজারি ও খাজনা আদায় করা যাচ্ছে না। এতে করে আগে যাদের নামজারি ও কর-খাজনা আদায় করা ছিল, এখন শুধু তাদেরই জমির দলিল রেজিস্ট্রি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে জমির কেনাবেচা অনেক কমেছে। আগে এক মাসে ৩০০টি থেকে ৪০০টি দলিল রেজিস্ট্রি হতো। কিন্তু গত এক মাসে মাত্র একশোর মতো দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে।’
গজারিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুন শরীফ বলেন, ‘কারিগরি কিছু ক্রটির কারণে সার্ভারটি সম্পূর্ণ সচল হয়নি। আশা করছি, শিগগির তা সচল হবে। কাজেই যাদের আবেদন জমা আছে, এ মাসের মধ্যেই ক্লিয়ার করে দেওয়া হবে।’
মুন্সীগঞ্জ সদরের দলিল লেখক নকিব হোসেন বলেন, ‘আগের তুলনায় অর্ধেকের কম দলিল হচ্ছে। নতুন নামজারি ও কর রসিদ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই জমি কেনাবেচা কমে গেছে। এতে এখন আমাদের হাতে তেমন কোনো কাজ নেই বললেই চলে।’
সদর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দীন আব্দুল্লাহ্ বলেন, ‘গত এক মাস ধরে ভূমি রেজিস্ট্রেশন কমেছে। তবে কিছু কিছু হচ্ছে।
আগের তুলনায় আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দলিল কম হচ্ছে।’
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেএম হাসানুর রহমান বলেন, ‘২য় পর্যায়ে সফটওয়্যার আপগ্রেড হয়েছে। তবে এখনো ভূমিসেবায় কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। আমরা সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত ভূমি মন্ত্রণালয়কে জানাচ্ছি। খুব শিগগিরই সমস্যা সমাধান হবে বলে তারা জানিয়েছেন।’