‘ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর হওয়া উচিত’ বলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে নির্বাচন বিলম্বিত হতে পারে। সরকার হয়তো বিশেষ কাউকে সুবিধা দিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। মানুষ এখন মনে করছে প্রধান উপদেষ্টা জেনেশুনে এমন কথা বলেননি। তিনি অন্য কারও কথা বলছেন। যারা দল করতে চাইছে তাদের সুবিধার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
গত শুক্রবার রাজধানীর ফার্মগেট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আয়োজিত দুই দিনব্যাপী জাতীয় সংলাপ-২০২৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বলেন, ‘তরুণরা সংখ্যায় বেশি। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা আগ্রহী। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মতামত নেওয়ার জন্য আমি মনে করি ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর নির্ধারিত হওয়া উচিত।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের শিশু হিসেবে ধরা হয়। তারা অপরাধ করলে তাদের বিচার হয় শিশু আদালতে। তাদের কারাগারে না রেখে কিশোর সংশোধনাগারে রাখা হয়। শুধু তাই না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু হিসেবে বিবেচনা করে। তাই শিশুদের ভোটার করা যায় না। করা উচিত নয়। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা। ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘ভোটারের বয়স ১৭ করার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিতর্ক সময় নষ্ট করবে। কেউ ১৬ বছর করতে বলতে পারে। কেউ আবার ২০ বছর করতে বলতে পারে। এগুলো অর্থহীন সিদ্ধান্ত।’
তার এমন বক্তব্যের একদিন পর গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) উদ্যোগে ১৭তে না বিএনপির আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মনে করেন ভোটার হওয়ার বয়স ১৭ বছর হওয়া উচিত। এখন তাহলে আবার নতুন করে ভোটার তালিকা করতে হবে। আপনি প্রধান উপদেষ্টা, প্রথমেই বলে দিচ্ছেন, ভোটারের বয়স ১৭ হলে ভালো হয়। আপনি যখন বলছেন, তখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এটা ইসির কাজ, তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ভোটারের বয়স ১৮ বছর তো আছে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। যদি কমাতে চান, সেটা ইসি প্রস্তাব করুক। এভাবে না বলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়টা আনা উচিত ছিল, এটা ভালো হতো। তাহলে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি হতো না। মানুষের মনে এখন বেশি করে আশঙ্কা তৈরি হবে, এটা করতে গিয়ে আরও সময় যাবে, কালক্ষেপণ হবে। এটা আমার না, মানুষের মনে ধারণা তৈরি হচ্ছে। তাদের মনে ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে, কেন যেন এই সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কাজে হাত দিয়েছে। এ অবস্থায় বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল চায় সরকার প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কারকাজ শুরু করে দ্রুত দেশকে একটি নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকার সেদিকে পুরোপুরি মনোযোগ না দিয়ে এমন কিছু কাজে হাত দিচ্ছে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য নয়। এমনকি এ ধরনের প্রস্তাব সরকারের সঙ্গে বৈঠকে কোনো রাজনৈতিক দল দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ভোটারের বয়স ১৭ করা নিয়ে একটি বক্তব্য রেখেছেন প্রধান উপদেষ্টা। বিষয়টি কাক্সিক্ষত নয়। এতে বরং সময় নষ্ট হবে এবং নির্বাচন বিলম্বিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার হয়তো বিশেষ কাউকে সুবিধা দিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে। মানুষ এখন মনে করছে প্রধান উপদেষ্টা জেনেশুনে এমন কথা বলেননি। তিনি অন্য কারও কথা বলছেন। যারা দল করতে চাইছে তাদের সুবিধার জন্য এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।’
বিএনপি নেতারা বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও নেতারা তারা যা চাইতেন তা প্রকাশ করতেন। এরপর সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব হয়ে পড়ত তা বাস্তবায়ন করার। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ভোটারের বয়স নিয়ে যে মত প্রকাশ করেছেন তাতে একইভাবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সে পথে হাঁটতে পারে। ভোটারের বয়স ১৭ করতে ইসি উদ্যোগ নিলে সময় নষ্ট হবে। নির্বাচন বিলম্বিত হবে। অথচ দেশের জনগণ দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেননি। তারা ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। তাছাড়া সচিবালয়ে অগ্নিকান্ডসহ দেশে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। এতে দেশের পরিস্থিতি যেকোনো সময় যেকোনো দিকে টার্ন নিতে পারে। তাই সরকারের উচিত হবে রুটিন কাজের পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা এবং দেশকে নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাওয়া।’ তারা বলেন, ‘সরকার নতুন নতুন বিষয় সামনে নিয়ে আসছে। এতে করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হবে। সময় নষ্ট হবে। এতে সরকারের জরুরি কাজগুলো পেছনে পড়ে যাবে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে অন্য উপদেষ্টারা বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য রাখছেন। তাদের বক্তব্য আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এখনই এ বিষয়ে আমরা চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে চাই না। তবে একটা কথা বলতে চাই, দেশে রাজনীতিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও দেশকে দ্রুত একটি নির্বাচনে দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তাই সরকারের উচিত হবে না এমন কোনো বক্তব্য কিংবা মন্তব্য করা যাতে ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে।’