চাকরি ফেরতের দাবিতে সড়কে চাকরিচ্যুত সেনারা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ঢাকার জাহাঙ্গীর গেটের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এতে জাহাঙ্গীর গেট হয়ে চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহন আটকা পড়ে। এ সময় ওই সড়ক ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট হয়। চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা গতকাল রবিবার বেলা সোয়া ১১টা থেকে ওই সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে মহাখালী থেকে জাহাঙ্গীর গেট অভিমুখের সড়কে সীমিত পরিসরে যান চলাচল করতে দেওয়া হয়। সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনকারীরা সড়ক থেকে সরে যান। তারপর ওই এলাকায় যান চলাচল পুরোদমে শুরু হয়।

এদিকে ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আবারও রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিএসএমএমইউ ও বিসিপিএসের অধিভুক্ত পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি চিকিৎসকরা। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে তাদের সমাবেশ শুরু হয়। টানা ১১ ঘণ্টা পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে শাহবাগ ছাড়েন। ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিসের (ডিএমজে) ব্যানারে এ সমাবেশে যোগ দেন বিভিন্ন মেডিকেলের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকরা।

ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এই দুই জায়গার সড়কে অবরোধ থাকায় তেজগাঁও ও রমনার বিভিন্ন এলাকায় যানজট দেখা দেয়। বিশেষ করে মহাখালী, বনানী, তেজগাঁও, বিজয় সরণি এবং শাহবাগ, রমনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানজট তীব্র আকার নেয়।

জাহাঙ্গীর গেটের সামনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্ল্যাটফর্ম ‘সহযোদ্ধা’র ব্যানারের কর্মসূচিতে তাদের পরিবারের সদস্যরাও যোগ দেন। তাদের অবস্থানের কারণে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বনানীর দিকে যাওয়া-আসা এবং সেনানিবাসে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার তানিয়া সুলতানা বলেন, আন্দোলনে জাহাঙ্গীর গেট এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় চারপাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুরের পর থেকে আস্তে আস্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ওসি মোবারক হোসেন বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। পরে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিলে দুপুর ১টার দিকে সড়ক থেকে সরে যান তারা।’

বিভিন্ন সময় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজে জড়ানোর অভিযোগে চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্ল্যাটফর্ম ‘সহযোদ্ধা’-এর ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা সকাল ৮টা থেকে জাহাঙ্গীর গেটের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে তারা সড়কে বসে পড়ে বিক্ষোভ করেন।

তাদের তিন দফা দাবি হলো চাকরিচ্যুতির সময় থেকে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ চাকরি পুনর্বহাল করতে হবে। যদি কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের চাকরি পুনর্বহাল করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের সরকারি সব সুযোগ-সুবিধাসহ সম্পূর্ণ পেনশনের আওতাভুক্ত করতে হবে এবং যেসব আইনি কাঠামো ও একতরফা বিচারব্যবস্থার প্রয়োগে শত শত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, সেই বিচারব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে।

সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিক্ষোভকারী ব্যক্তিদের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে আন্দোলনকারীদের প্রধান সমন্বয়ক মো. নাঈমুল ইসলাম বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে একটি পর্ষদ গঠন করে দাবিগুলোর বিষয়ে আলাপ-আলোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন এস এম এনামুল হাসান ঘটনাস্থলে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা দাবিগুলো পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা আপনাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে বলেছি। ওনারা একটা টাইমলাইন বেঁধে দিয়েছেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ওই টাইমলাইনের মধ্যে দাবিগুলো পূরণের ব্যবস্থা নিতে। আমরা আপনাদের সঙ্গে সমব্যথী।’ এরপর জাহাঙ্গীর গেটের সামনের সড়ক থেকে উঠে যান বিক্ষোভকারীরা। তারা স্বাধীনতা ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।

সহযোদ্ধা প্ল্যাটফর্মের প্রধান সমন্বয়ক নাইমুল ইসলাম বলেন, ‘স্যাররা তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে কথা বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। তারা বলেছেন আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। তিন বাহিনীর প্রধানের প্রতি আমাদের আস্থা রাখতে হবে। এজন্য আমরা অবরোধ তুলে নিলাম।’

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একজন সাবেক সেনাসদস্য বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একতরফা বিচারের মাধ্যমে শত শত সদস্যকে চাকরিচ্যুত করেছে। তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কাউকে কাউকে আয়নাঘরে বন্দি করে অমানবিক নির্যাতনও করা হয়েছে।’

এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে স্মারকলিপি দেন চাকরি হারানো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানান ৫০ জনের বেশি চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য।

১১ ঘণ্টা পর শাহবাগ ছাড়লেন চিকিৎসকরা : টানা ১১ ঘণ্টা পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে রাজধানীর শাহবাগ ছেড়েছেন পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি চিকিৎসকরা। গতকাল রবিবার রাত ১১টায় শাহবাগ থেকে অবরোধ তুলে নেন তারা। রাত ১০টার দিকে শাহবাগে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ সময় চিকিৎসকরা জানান, আজ সোমবার সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জমায়েত হবেন চিকিৎসকরা। সেখান থেকে বেলা ১১টায় তারা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী জানুয়ারি থেকে ৩৫ হাজার এবং জুলাই থেকে ৫০ হাজার টাকা বাড়ানোর দাবি করবেন। পাশাপাশি কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।

এর আগে দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের সঙ্গে তার মিন্টো রোডের বাসভবনে বৈঠক করেন ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিসের চিকিৎসকরা। ওই বৈঠক শেষে আন্দোলনকারীরা জানান, সরকার তাদের জানুয়ারি থেকে ৩০ হাজার ও জুলাই থেকে ৩৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকের দাবি ছিল ৫০ হাজার টাকা। বৈঠকে চিকিৎসকরা ৫০ হাজার টাকার দাবি থেকে সরে এসে জানুয়ারি থেকেই ৩৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। দাবি পূরণ হলেই তারা শাহবাগ ছেড়ে যাবেন।

পরে চিকিৎসকরা শাহবাগ অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। সন্ধ্যায় শাহবাগ মোড়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে সড়কে বসে থাকতে দেখা যায় আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের। তারা ওই সড়কের বিভিন্ন অংশে জটলা করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।

এর আগে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি চিকিৎসকদের ভাতা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান করে গতকাল সকাল থেকে বিক্ষোভ করেন চিকিৎসকরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা শাহবাগের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন।

কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান নাগরিক কমিটির : এর আগে রাতে জাতীয় নাগরিক কমিটি আন্দোলনরত চিকিৎসকদের দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয় ‘আমরা বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানাই। ইতিমধ্যে গত সাত দিন ধরে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন। এতে করে অসহায় রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চিকিৎসকের কাজ রোগীর সেবা করা তাদের জিম্মি করা নয়। আমরা চিকিৎসকদের অনুরোধ করব আপনারা শাহবাগ ছেড়ে হাসপাতালে যান, মানুষের ভোগান্তি দূর করুন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয় ‘আমরা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করছি, চিকিৎসকদের ন্যায়সংগত যেকোনো আন্দোলনের সঙ্গে আমরা একাত্মতা পোষণ করব। কিন্তু রাষ্ট্রবিরোধী ও স্বৈরাচারদের উসকানিতে কোনো আন্দোলন করা হলে সেখানে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না। যেহেতু দেশের চিকিৎসকদের তিনটি বড় সংগঠন সরকারের ঘোষণার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে, কাজেই আমরা বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের ভাতা বৃদ্ধির সঙ্গে পূর্বে একমত পোষণ করলেও এখন এই আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’