মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়ানো টিকিট প্রত্যাশীদের ভিড় ঠেলে মিডিয়া সেন্টারের দিকে যাওয়ার যে পথ, তার বাম পাশেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একাডেমি মাঠ। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) মৌসুমে এই মাঠ হয়ে যায় ক্রিকেটারদের হাট। বিচিত্র বর্ণের নানান জার্সি গায়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের ক্রিকেটাররা এই আয়তক্ষেত্রেই অনুশীলন করেন, যে ছবিটা ১১তম আসরে এসেও বদলায়নি। তবে ছবিটা সাংবাদিকরা যাতে তুলতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। কালো কাপড়ের পর্দায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে একপাশ। বিপিএলের একাদশ আসরকে তাই ‘পর্দানশিন’ বলা যেতেই পারে, আজ দুপুর দেড়টায় দুর্বার রাজশাহী-ঢাকা ক্যাপিটালসের ম্যাচ দিয়ে যে আসরের যাত্রা শুরু হচ্ছে। এবারের বিপিএলে দর্শকদের পানি কিনে খেতে হবে না মাঠের ভেতর, এটা আগেই জানিয়েছিল বিসিবি। রবিবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিসিবি জানিয়েছে, পুষ্টি ড্রিংকিং ওয়াটার-এর সৌজন্যেই দর্শকরা গলা ভেজাবেন বিনে পয়সায়।
ঢাকার ক্রিকেট সাংবাদিকদের মধ্যে চালু একটা শব্দবন্ধ হচ্ছে ‘বিপিএল সিনড্রোম’। বিপিএল মানেই হযবরল, বিপিএল মানেই কিছু বাড়তি বিতর্ক, বিপিএল মানেই সবকিছু শেষ মুহূর্তে করার প্রচেষ্টা। ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টটির মাঠের খেলার যা মান, আয়োজনেও সেই একই অবস্থার ছাপ বোঝাতেই এই বিশেষণ। ‘পর্দানশিনতা’র কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। ক্রিকেট বোর্ডের বক্তব্য হচ্ছে অনুশীলনরত খেলোয়াড়রা আপত্তি জানিয়েছেন, তাদের ভিডিও তুলে নাকি ‘ভাইরাল’ করে দেওয়া হচ্ছে। একাডেমি মাঠে সেই অর্থে কোনো ড্রেসিংরুম নেই। একই মাঠে একসঙ্গে গোটা তিন-চারেক দল অনুশীলন করে, একদল আসছে তো অন্যরা যাচ্ছে। এই তাড়াহুড়োয় অনেক ক্রিকেটারই মাঠের এক পাশে পোশাক পরিবর্তন করেন। ক্রিকেটারদের থাইপ্যাড, অ্যাবডোমিনাল গার্ডসহ অনেক কিছুই পরতে হয় যা পরা ও খোলার সময়ের ভিডিও ধারণ করলে সেটা খুবই নিন্দনীয়। এই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়েছিল ফরচুন বরিশাল-এর অধিনায়ক তামিম ইকবালের কাছে, তার উত্তর, ‘বরিশালের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। তবে আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলব এটা নিয়ে আমি খুবই খুশি।’ অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে পর্দাকা-ে সম্মতি আছে ক্রিকেটারদেরও।
দিন-তারিখ ঘোষণার পর থেকেই যেভাবে বিপিএলের নতুনত্বের আওয়াজ শোনানো হচ্ছে, বাস্তবে তার উপস্থিতি সামান্যই। তামিমই বললেন, ‘আমি সত্যি কথা বলতে অন্যরকম কিছু দেখি না কনসার্ট ছাড়া। আমার কাছে মনে হয় অন্যরকম বিপিএল যদি আমাদের করতে হয়, আমাদের ক্রিকেটে বিনিয়োগ করতে হবে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের টুর্নামেন্টে ইনভেস্ট করতে হবে, কনসার্ট বা অন্য কিছুতে না। ক্রিকেটে যদি বিনিয়োগ করি, টুর্নামেন্টে যদি বিনিয়োগ করি; তখন আমরা বলতে পারব যে এটা নতুন করে বিপিএল। কনসার্ট আগেও হয়েছে, এখনো হয়েছে।’ কনসার্ট ছাড়াও যে নতুনত্বের কথা বলা হয়েছিল, বিসিবির বোর্ড পরিচালকদের সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিসিবি। শতভাগ অনলাইনে টিকিট বিক্রি সম্ভব হয়নি। টিকিট বিক্রির সার্ভার বিকল ছিল। বিসিবির প্রধান ফটকের সামনে দিনভর ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের জটলা, তাদের জিজ্ঞাসা ছিল টিকিটের প্রাপ্যতা নিয়ে। অবশেষে বিসিবি জানায়, িি.িমড়নপনঃরপশবঃ.পড়স.নফ
ওয়েবসাইট থেকে এবং মধুমতি ব্যাংকের নির্ধারিত কিছু শাখা থেকে কেনা যাবে টিকিট। দাম সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা।
বিপিএলের বেশিরভাগ দলই এখনো অধিনায়ক নির্বাচন করে উঠতে পারেনি। সিলেট স্ট্রাইকার্সে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা আছেন, তবে তিনি আদৌ খেলবেন কি না সেই প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি। তিনি থাকাতেই বোধহয় জাকের আলী অনিক বা জাকির হাসানরা অধিনায়ক হতে চাচ্ছেন না। দুর্বার রাজশাহীও কাল দুপুরের সংবাদ সম্মেলন অবধি অধিনায়ক বাছতে পারেনি। সন্ধ্যা নাগাদ চিটাগাং কিংস জানিয়েছে তাদের অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন। ঢাকা ক্যাপিটালস দেশের এক নম্বর নায়কের দল, জনপ্রিয় নায়ক নায়িকাদের নিয়ে কোটি টাকার থিম সং বানিয়েছে। কিন্তু অধিনায়ক করেছে এক বিদেশিকে। শ্রীলঙ্কার থিসারা পেরেরার হাতেই রাজধানীর দলের নেতৃত্বভার।
আক্ষরিক অর্থেই নতুন যে উদ্যোগ যোগ হয়েছে বিপিএলের সঙ্গে তা হচ্ছে দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে পানীয় জলের ব্যবস্থা। জুলাই গণআন্দোলনে প্রাণ হারানো মীর মুগ্ধের নামে ‘মুগ্ধ কর্নার’ করা হবে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। সেখানেই রাখা হবে বিনামূল্যে পানি পানের ব্যবস্থা। বিপিএলের ড্রিংকিং পার্টনার পুষ্টি কনজিউমারের ব্যবসায়িক প্রধান আলম চৌধুরী জানান, বিনামূল্যে পানির জন্য পুরো স্টেডিয়ামে ছয়টি কর্নার থাকবে। এর প্রতিটিতে চারটি করে বুথে একসঙ্গে পানি পান করতে পারবেন দর্শকরা। এই প্রসঙ্গে টিকে গ্রুপের ব্যবসা পরিচালক মোফাসসের হক বলেন, প্রতি দিন ৫ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ১০ হাজার বেশি দর্শকের জন্য পানির ব্যবস্থা করতে পারবেন তারা। চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজন পড়লে আরও বেশি পানিও সরবরাহ করা হবে বলে জানান তিনি। টুর্নামেন্টের অন্য দুই ভেন্যু সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামেও ‘মুগ্ধ কর্নার’-এর মাধ্যমে বিনামূল্যে পানির ব্যবস্থা করা হবে বলেন বিপিএলের সদস্য সচিব নাজমুল আবেদীন। স্টেডিয়ামে এসে চড়ামূল্যে পানি কিনে পান করার দুর্ভোগ আর পোহাতে হবে না দর্শকদের, এটাই আপাতত বড় স্বস্তি।
প্রায় প্রতি বছরই নিয়ম মেনে বিপিএল হয়। মালিক পক্ষ চেয়ার নিয়ে ডাগআউটের পাশে বসেন, অনেক প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরে সেসব পূরণ করতে ভুলে যান। একই সঙ্গে ভুলে যান অনেকের পাওনা টাকা পরিশোধ করতেও। একাদশ আসরে পা রেখেও একটা শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক আসরটি। কালো পর্দা আর বিনামূল্যের পানীয় জলের ব্যবস্থায় সেই ব্যর্থতা খুব একটা আড়াল হচ্ছে না।