ঢাবিতে ‘ঘৃণাস্তম্ভের’ গ্রাফিতি মোছায় উত্তেজনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)-সংলগ্ন মেট্রো স্টেশনের পিলারে থাকা দেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রাফিতি ৫ আগস্টের পর ‘ঘৃণার প্রতীক’ হয়ে ওঠে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ফ্যাসিবাদবিরোধী ঘৃণাস্তম্ভ সংরক্ষণ ফলক স্থাপন করেছেন বামপন্থি ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের একদল নেতাকর্মীরা। এ ছবিতে বিভিন্ন সময় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জুতা নিক্ষেপ, এমনকি লাল রঙ পর্যন্ত লেপটে দেওয়া হয়। এবার সেই ঘৃণাস্তম্ভ মুছে ফেলাকে ঘিরে শনিবার রাত আড়াইটার দিকে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিও তোলেন। এদিকে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে গতকাল রবিবার দুঃখ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল দপ্তর। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমরা অতি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ‘২৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পেছনে মেট্রোরেলের দুটি পিলারে থাকা শেখ মুজিব এবং স্বৈরাচার শেখ হাসিনার ঘৃণাসূচক গ্রাফিতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। জুলাই আন্দোলনে এই দুটি গ্রাফিতি বিপ্লব, প্রতিরোধ এবং ফ্যাসিবাদ ধ্বংসের প্রতিনিধিত্ব করে। এই স্মৃতিকে তাজা রাখা এবং প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এটি প্রক্টরিয়াল টিমের অনিচ্ছাকৃত ভুল। এজন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমরা আরও সতর্ক থাকার অঙ্গীকার করছি।’

এতে আরও বলা হয়, ‘প্রক্টরিয়াল টিমের উপস্থিতিতে গত রাতেই শিক্ষার্থীরা মুছে ফেলা গ্রাফিতি অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে এঁকেছেন। এই স্তম্ভটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক ঘৃণাস্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এই ঘৃণাকে যুগ যুগ ধরে সংরক্ষণের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গ্রহণ করবে।’

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত ২টার দিকে ঘৃণাস্তম্ভটিতে থাকা গ্রাফিতি মুছে ফেলা হচ্ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষার্থীরা এই গ্রাফিতি মুছে ফেলার প্রতিবাদ জানান। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তখন মেট্রোরেলের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে থাকা এই কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইউসুফ আহমেদ শিক্ষার্থীদের জানান, এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার কথা।

এ সময় শিক্ষার্থীরা এমন ঘটনার প্রতিবাদে ‘বাহ্ প্রক্টর চমৎকার, স্বৈরাচারের পাহারাদার’, ‘খুনির ছবি মুছল কারা, স্বৈরাচারের দোসর তারা’, ‘জুলাইয়ের চেতনা বৃথা যেতে দেব না’, ‘ঘৃণাস্তম্ভ মুছল কেন, প্রক্টর জবাব চাই’, ‘খুনি হাসিনার দালালরা হুঁশিয়ার-সাবধান’, ‘লেগেছেরে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’সহ নানা সেøাগান দিতে থাকেন, যা চলে ৪টা পর্যন্ত। এর মাঝে সাড়ে ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

এ সময় প্রক্টর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন মন্ত্রণালয়ের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি পাঠালে, তখন এখানে থাকা দুটি ছবিও (শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা) চলে যায়। তখন প্রশ্ন তোলেন, এখনো কেন এই দুজনের ছবি থাকবে? পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অফিসারকে জানানো হলে, স্টেট অফিসার মেট্রোরেলকে বললে পরে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ তাদের লোক পাঠিয়ে এটা মুছে ফেলেছে।’

শুধু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থী, অ্যকাটিভিস্টসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ এর প্রতিবাদ করেন। পরে রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীনের উপস্থিতিতে নতুন করে একটি ছবি আঁকা হয়। এটি এঁকেছেন ছাত্র ইউনিয়ন চারুকলা অনুষদ শাখার সদস্য মৃধা রাইয়ান ও ঋষি।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য চত্বরের কাছে মেট্রোরেলের পিলারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে গ্রাফিতি ছিল, সেটি মুছে ফেলার বিষয়টি জানে না সরকার। তবে সেই গ্রাফিতিকে সংরক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আজাদ মজুমদার বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই গ্রাফিতি ঢাবি সংরক্ষণ করবে। আর শেখ হাসিনার গ্রাফিতিটি ঘৃণাস্তম্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।’ এ সময় তিনি জানান, ঢাবির গ্রাফিতি মোছার বিষয়টি সরকার জানে না।