আওয়ামী লীগ নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের বাড়িটি ছিল রাজশাহী শহরের সবচেয়ে প্রতাপশালী ভবন। কিছুদিন আগেও বাড়িটির সামনে থাকত নিয়মিত পুলিশি পাহারা। সমাজের নামিদামি মানুষের পদচারণা ছিল এ বাড়িতে। গত ৫ আগস্ট ক্ষোভের আগুনে পুড়েছে এটি; লুটপাট হয়েছে ওই দিনই। এখন ভুতুড়ে এক ভাঙা ভবন। বাড়িটিতে আগুন দেওয়া হয়েছে; জানালা-দরজাও খুলে নিয়ে গেছে ক্ষুব্ধ জনতা। এক সময়কার হাই সিকিউরিটির বাড়িটিতে এখন কুকুর-বিড়ালও ইচ্ছেমতো ঢুকতে পারে। নগরবাসীর অনেকে বাড়িটি দেখতে যান শখ করে।
প্রায় এক দশক ধরে রাজশাহী শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। নগরীর উপশহর এলাকার ৩ নম্বর সেক্টরের বাড়িটিকে প্রাসাদ মনে করা হতো। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের বাড়ির সামনে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগমন ঘটত। প্রভাবশালী মানুষদের যাতায়াত ছিল এখানে। সে বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ। আসবাবপত্র সব লুট হয়ে গেছে।
রাজশাহী নগরীর উপশহরের ৩ নম্বর সেক্টরের তিনতলা বাড়িটির ভেতরে-বাইরে বেশ কিছু কাজের লোকের তৎপরতা চোখে পড়ত সবসময়ই। প্রধান ফটকের সামনে একের পর এক মানুষের আগমন ঘটত। সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা মানুষগুলোকে সারা দিনই এ চাপ সামলাতে হতো। বাড়ির ওপরে যাওয়ার সুযোগ সব মানুষের হতো না। দর্শনার্থীরা নিচের তলায় অপেক্ষা করতেন। কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান এ প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো তাদের। কারণ একই বাড়িতে নেতা ছিলেন তিনজন। প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার মেয়র লিটন ছাড়াও এ বাড়িতে আরও দুজন সক্রিয় নেতা থাকতেন।
একজন লিটনপতœী শাহিন আক্তার রেণী, আরেকজন তাদের বড় মেয়ে আনিকা ফারিহা জামান অর্ণা। রেণী ছিলেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। অর্ণা জামান রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছাড়াও দলের বিভিন্ন কমিটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপেরও নেতা ছিলেন তিনি। বাড়ির আরেক সদস্য খায়রুজ্জামান লিটনের ছোট মেয়ে বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়া মাইশা সামিহা জামান শ্রেয়া ছিলেন রাজনীতির বাইরের মানুষ। তার বিচরণ ছিল পড়াশোনার জগতেই।
মেয়র লিটন বাড়িতে লোকজনের সঙ্গে কম দেখা করতেন। তবে, বাড়ি থেকে বের হওয়া বা বাড়িতে প্রবেশের সময় নিচতলার চেম্বারে কিছু লোক তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেতেন। আর প্রভাবশালী মানুষেরা দ্বিতীয় তলায় দেখা করতেন। নগর ভবনে সাক্ষাৎ করতেন নেতাকর্মীরা।
খায়রুজ্জামান লিটন ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো এ শহরের মেয়র হন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের কাছে পরাজিত হন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও মেয়র হন। ২০২৩ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আবারও তিনি মেয়র হন। যদিও পরের দুই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেয়রের ক্ষমতাবলেই লিটন ছিলেন রাজশাহী শহরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। ২০২১ সালের নভেম্বরে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মনোনীত হন।
বাড়িটি ছিল খুবই পরিচিত। রিকশাচালক থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে বাড়িটি পরিচিত ছিল। হঠাৎ এ বাড়ির চেহারা বদলে গেছে। সারাক্ষণ ঝকঝকে তকতকে বাড়িটি এখন ধ্বংসস্তূপ। সামনের লোহার গেটটি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। বাড়ির বিদ্যুতের ওয়্যারিং করা তার, সুইচও উপড়ে ফেলা হয়েছে। ঘরে-বাইরে থাকা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতার ছবির একটিও অবশিষ্ট নেই। বাড়ির কোনো শো-পিসও নেই। সোফা, চেয়ার-টেবিলের কিছুই অবশিষ্ট নেই। ৫ আগস্ট বিকেলে বিক্ষুব্ধ মানুষ বাড়িটির ওপর হামলে পড়ে। নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা সামান্য কিছু জিনিস আছে সেখানে। ফ্রিজারে রাখা খাবার, রান্নাঘরের থালাবাটি, ফ্রিজার, সোফা, এসি সবকিছু লুট হয়ে গেছে। কাপড়-চোপড়ও নিয়ে গেছে ক্ষুব্ধ লোকজন। কিছু বইপত্র ও কাগজপত্র এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। রান্নাঘরের বেসিনের সিংকও নেই। বাথরুমের কমোডও খুলে ফেলা হয়েছে।
বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, লিটন-রেণীর সাজানো সংসারের নিচতলায় ও দ্বিতীয় তলায় ভাঙচুর আর লুটপাট হয়েছে। তৃতীয় তলায় ভাঙচুরের পর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির ছাদের ওপরে আংশিক কিছু স্থাপনা ছিল সেগুলোও ভাঙচুর করা হয়েছে। শুধু আসবাবপত্র ভাঙচুর হয়েছে এমন নয়, বাড়ির অনেক অংশের টাইলসও তুলে ফেলা হয়েছে। পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন তিনতলা জুড়ে।
ওই এলাকার রিকশাচালক আসাদুল বললেন, ‘এটা ক্ষোভ থেকে হয়েছে। মানুষ এদের ওপর খুব রেগে ছিল। এরা মানুষকে মানুষ মনে করত না। লুটপাট করেছে। মানুষও সুযোগ বুঝে শোধ নিয়েছে।’
ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন অবশ্য এ কথা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘লিটন আর তার পরিবার যে সব কাজই খারাপ করেছে তা কিন্তু নয়। নিজেদের আখের গুছিয়েছে এটা যেমন সত্য তেমনি তারা রাজশাহীর জন্যও অনেক কিছু করেছে। আসলে সবই রাজনীতি। রাজনীতিতে যার যখন প্রভাব সে তখন যা ইচ্ছা তাই করে। যার ক্ষমতা থাকে না তাকে এভাবেই ভস্ম করে দেওয়া যায়।’
সুসাশনের জন্য নাগরিক-সুজনের রাজশাহীর সমন্বয়ক মিজানুর রহমান বলেন, ‘তার বাড়িতে এভাবে হামলা, লুট এটা এক ধরনের প্রতিহিংসা। এটিকে ক্ষোভ বলব না আমি। এটি সুযোগসন্ধানীরা করেছে। আমরা বলি, আজ আপনি যাকে শ্রদ্ধা করছেন সে যদি ক্ষমতায় নাও থাকে তাকে শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবেই মনে রাখা উচিত। এক সময় মানুষ এ বাড়িকে অনেক গুরুত্ব দিত। কিন্তু এখন তারা একেবারে নিচে নামিয়ে দিল। সুশাসনের জন্য এটা ভয়ংকর ব্যাপার। এ ঘটনা আগামী দিনে সুশাসনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। সুজন কারও বাড়িঘর ভাঙাকে সমর্থন করে না। যদি কারও কাজে ত্রুটি থাকে তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি থেকে নেতাদেরও শিক্ষা নেওয়ার আছে। জনগণের নেতা হতে হবে। মানুষের নেতা হলে মানুষের আপনার ওপর ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা নয়। ভালো নেতার নৈতিক গুণ ও কার্যাবলির গুণ দুটোই থাকতে হবে।’