বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত পুরোটাই ‘আরাকান আর্মির’ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশটা মিয়ানমারের আর সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরাকান আর্মির। ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের। উভয় পক্ষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগও রয়েছে। গতকাল সোমবার কক্সবাজারের টেকনাফের সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম যখন টেকনাফ সীমান্ত পরিদর্শন করছিলেন তখন কক্সবাজারের টেকনাফে বন বিভাগের সরকারি পাহাড় পরিষ্কার করতে যাওয়া তিন বনকর্মীসহ ১৭ জন শ্রমিককে অপহরণ করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ইতিমধ্যে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে একজন গ্রহণযোগ্য এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ড. খলিলুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বিষয়টি সার্বক্ষণিকভাবে নজর রাখছেন। সীমান্ত এলাকায় আমাদের কোনো সমস্যা নেই। বিজিবিসহ সব বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে যেন আইনশৃঙ্খলা সব সময় স্বাভাবিক থাকে, তার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাতের জেরে ৫০ থেকে ৬০ হাজার নতুন রোহিঙ্গা আমাদের দেশে অনুপ্রবেশের তথ্য স্বীকার করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন হয়নি। তাদের নতুন করে নিবন্ধিত করা হবে কি হবে না, তা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত জরুরি। তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নতুন অনুপ্রেবেশ করা রোহিঙ্গারা মানবিক সমস্যায় পড়ে এসেছেন। অনেকেই এসেছেন গুরুতর আহত হয়ে। ফলে তাদের ফেরত পাঠানোও খুবই জটিল হয়ে পড়েছে। নতুন আসা রোহিঙ্গারা বিভিন্ন মাধ্যমে খাবারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বেলা ১১টার দিকে হেলিকপ্টারে টেকনাফের বিজিবি ২ নম্বর ব্যাটালিয়ান সদরে অবতরণ করেন। ওখানে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে আলাপ, পরিদর্শন শেষে যান দমদমিয়ার নাফ নদের মোহনায়। নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে সীমান্তের ওপারে দেখেন এবং কথা বলেন বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। ওখানেই তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টেকনাফ এবং টেকনাফের বদি মাদকের জন্য বিখ্যাত। এখানে মাদকের সমস্যা দীর্ঘ পুরনো। নাফ নদের বাংলাদেশের অংশের জালিয়ারদিয়া চরে কিছু অপরাধী ছিল। যারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করত। বর্তমান সরকার আসার পর চর থেকে তাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। মাদক পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। এর জন্য সীমান্তের সব মানুষকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানাই।
মাদক নিয়ন্ত্রণে মসজিদের মাওলানাদের জুমার নামাজসহ বিভিন্ন সময় সচেতনতার প্রচারের অনুরোধও জানান তিনি।
নাফ নদে মাছ ধরা ও গরু আমদানির করিডর চালু বিষয়ে মিয়ানমারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন সময় গোলাগুলির শব্দ এপারে শোনা যায়। গোলা-বারুদও এপারে এসে পড়ে। ফলে নাফ নদে মাছ ধরা এখন নিরাপদ না। পরিস্থিতির উন্নত হলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। গরু আমদানি বন্ধ থাকায় দেশের খামারিরা খুশি এবং পশু সংকটও নেই। পরিস্থিতির উন্নত হলে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই করিডরের ব্যাপারে বলা যাবে।
পাহাড়ে ৩ বনকর্মীসহ ১৭ শ্রমিক অপহৃত, চালানো হবে যৌথ অভিযান : গতকাল সকাল ১০টার দিকে উপজেলার হ্নীলার ইউনিয়নের জাদিমোরার পশ্চিমের পাহাড় পরিষ্কার করার সময় তিন বনকর্মীসহ ১৭ শ্রমিককে অপহরণ করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এরপর অপহরণকারীরা মুক্তিপণের জন্য অপহৃতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। তবে অপহরণের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশ, এপিবিএন ও র্যাব স্থানীয় জনতার সহায়তায় পাহাড়ে অভিযান চালালেও কাউকে উদ্ধার করতে পারেনি। ফলে যৌথ অভিযানের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে অনুমতি চেয়েছে জেলা পুলিশ।
অপহৃতরা হলেন বন পাহারা দলের মাঝি জুহুর আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২২), আইয়ুব খান (১৮), আইয়ুব আলী (৫০), আনসার উল্ল্যাহ (১৮), আয়াত উল্ল্যাহ (২২), সামছু (৪৫), ইসলাম (২১), সামছু (৪০), ইসমাইল (৩৫), মোহাম্মদ হাসিম (৪০), নূর মোহাম্মদ (২১), সৈয়দ আমিন (৩০), সফি উল্ল্যাহ (৩০), আইয়ুব (৫০), মাহাতা আমিন (১৮), সৈয়দ (৫০) ও রফিক (৩৩)।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড়কেন্দ্রিক পুলিশের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত ডাকাত দলের সহযোগিতায় জাদিমোড়া শালবাগানের (২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প) সশস্ত্র রোহিঙ্গা ডাকাতরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। দলটি এবারও ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোন থেকে মুক্তিপণ চেয়ে অপহৃতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
বন বিভাগের টেকনাফের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ বলেন, গতকাল সকালে জাদিমোড়া পাহাড়ের বন বিভাগের জমি পরিচ্ছন্ন করতে যান ১৯ শ্রমিক। যাদের মধ্যে ১৭ জন সামনে এবং দুজন একটু পেছনে ছিলেন। ওই সামনের দলটি যখন বনের মাঝখানে থাকা ছোট খাল পেরিয়ে যান। তখন সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের জিম্মি করে অপহরণ করে। পেছন থেকে বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বাকি দুজন শ্রমিক পালিয়ে চলে আসেন। এরপর তারা বিষয়টি আমাকে জানালে আমি বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাই। তিনি আরও বলেন, অপহৃত মধ্যে একজন হলেন বন পাহারাদারদের মাঝি জুহুর আলমের ছেলে সাইফুল। তার (সাইফুলের) মোবাইল ফোন থেকে অপহরণকারীরা ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়ে জুহুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এটিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছি।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, আমরা অপহৃতদের নাম সংগ্রহ করে টেকনাফ থানায় সাধারণ ডায়েরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, গতকাল সকালের দিকে জাদিমোড়া এলাকা থেকে অপহৃত ১৭ শ্রমিককে উদ্ধারে দিনব্যাপী অভিযান চালায় পুলিশসহ স্থানীয়রা। তবে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
টেকনাফ থানার ওসি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালানোর মতো পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা আমাদের নেই। তবুও আমরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, গহিন পাহাড়ে এই অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সেখানে একক অভিযান চালানোর মতো সরঞ্জাম নেই। তাই আমরা যৌথ অভিযান চালানোর জন্য জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। আশা করছি, খুব দ্রুত আমরা একটি সফল অভিযান চালাতে পারব।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
এদিকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের তথ্য বলছে, গত এক বছরের বেশি সময়ে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫৩ জনকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে ৯৪ জন স্থানীয় বাসিন্দা, ৫৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৭৮ জন মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন বলে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
টেকনাফ থানার তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর এই পর্যন্ত টেকনাফ থানায় অপহরণের মামলা হয়েছে ১৪টি। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা অন্তত ৬৫। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩০ জনকে।