দেশে দীর্ঘদিন ধরেই ডলার সংকট চলছে। একদিকে সংকট অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে কয়েক বছর ধরেই বড় সমস্যায় ভুগতেছেন আমদানিকারকরা। এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে ব্যয় সংকোচন নীতিতে হাঁটছে সরকার। এতে সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমদানিও। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ডলার সংকট কিছুটা কমে আসছে। তবে এখনো স্বাভাবিক হয়নি আমদানি পণ্যের এলসি (ঋণপত্র) খোলা খোলা ও নিষ্পত্তি। চলতি অর্থবছরে নভেম্বর পর্যন্ত এলসি খোলার হার কিছুটা বাড়লেও কমেছে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ। এই সময়ের মধ্যে ভোগ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বেশ কিছু খাতে আমদানির এলসি কমেছে। তবে বেড়েছে শিল্প কারখানার কাঁচামাল আমদানির হার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মোট এলসি খোলা হয়েছে ২ হাজার ৮১২ কোটি মার্কিন ডলারের। গত বছরের একই সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮১০ কোটি ডলারের। সে হিসেবে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে দুই কোটি ডলার। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত এলসি নিষ্পত্তি ২ হাজার ৭৯৩ কোটি ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল দুই হাজার ৮১৭ কোটি ডলার। সে হিসেবে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ কমেছে ২৪ কোটি ডলার।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা হয়েছে ৭১ কোটি ২৬ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এলসি খোলা হয়েছিল ৯৬ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের। অর্থাৎ চলতি বছরের আলোচ্য সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ২৫ কোটি ৬৩ লাখ ডলার বা ২৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ ছাড়া জুলাই-নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছিল ১১০ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের জুলাই-নভেম্বরে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২৪ কোটি ২৬ লাখ ডলার বা ২১ দশমিক ৯০ শতাংশ।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, দুই বছর ধরেই দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি হচ্ছে না। ফলে জ¦ালানি অপর্যাপ্ততার কারণে অধিকাংশ শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কয়েক মাস ধরে শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। আবার এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে ঋণের সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। এটিও ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে তুলছে, অনেক কোম্পানি পড়েছে লোকসানে। অধিকাংশ কোম্পানি এখন প্রয়োজন না হলে ব্যবসা সম্প্রসারণে যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাপক হারে কমে গেছে। এ সময়ে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির হারও কমেছে।
মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির হার কমলেও বেড়েছে শিল্প কারখানার কাঁচামাল আমদানি। জুলাই-নভেম্বরে কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৯৮৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৯৩৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের আলোচ্য সময়ে শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ ছাড়া জুলাই-নভেম্বরে কাঁচামাল আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৯৩ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৮৯০ কোটি ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের জুলাই-নভেম্বরে এই খাতে এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ১০৩ কোটি ডলার।
এ ছাড়া জুলাই-নভেম্বর মাসে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ২৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে এসব পণ্যের এলসি খোলা হয়েছিল ২৬৫ কোটি ৩২ লাখ ডলারের। অর্থাৎ এ সময় ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ২৪০ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি করা হয়েছিল ২৭৭ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের। এ সময় ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
এদিকে এলসি ছাড়া চুক্তিপত্রের মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানের আমদানির সুযোগ সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে চুক্তিপত্রের আওতায় আমদানি বাণিজ্য বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী এলসি ছাড়া চুক্তিপত্রের আওতায় শিল্প প্রতিষ্ঠানের আমদানির সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। বছরে ৫ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য এলসি ছাড়া বাণিজ্যিক আমদানি করা যায় বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চুক্তির আওতায় আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টিং পোর্টালে দিতে হবে।
এ ছাড়া বিদেশি সরবরাহকারীর ক্রেডিট রিপোর্ট গ্রহণ বিষয়ে দিকনির্দেশনা সার্কুলারে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে মূল্য পরিশোধ করা না হলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের পক্ষে চুক্তির মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রম না করতে বলা হয়েছে। সার্কুলারে নির্দেশনা বিশেষায়িত অঞ্চলে (ইপিজেড ও ইজেড) চুক্তির মাধ্যমে আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এ ছাড়া স্বাভাবিক নিয়মে আমদানির জন্য স্বল্পমেয়াদি আমদানি ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। চুক্তির আওতায় আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক নিজেই স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ নিতে পারবে আমদানি দায় পরিশোধ করার জন্য। তবে বিদেশি ঋণদাতা সরবরাহকারীকে এলসি বা এসবিএলসি কিংবা গ্যারান্টি দিতে পারবে। আমদানির জন্য গৃহীত বিদেশি ঋণ এবং সুদ ঋণের শর্ত অনুযায়ী পরিশোধ করতে পারবে।
আমদানির জন্য স্বল্প মেয়াদি আমদানি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমদানিকারকের পক্ষ থেকে করপোরেট, ব্যক্তিগত বা তৃতীয় পক্ষ গ্যারান্টি প্রদানের সাধারণ অনুমোদন সুযোগ দেওয়া হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাণিজ্যিক আমদানি ৬০ দিনের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
আমদানির বিষয়ে এই নির্দেশনা বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন দ্বার আরও উন্মোচন হয়। এ সুবিধার মাধ্যমে থার্ড কান্ট্রি ইমপোর্ট কিংবা থার্ড কান্ট্রি এলসি বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর হয়। বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্কের ভিত্তিতে ঘোষিত পদ্ধতি অনুসরণ করে এলসি ছাড়া আমদানি করার সুযোগ তৈরি হয়।