এক মৃদু শৈত্যপ্রবাহে শেষ হলো ডিসেম্বর। জানুয়ারিও কি একই পথে যাবে? গত ১৩ ডিসেম্বরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তেঁতুলিয়ার সেই মৃদু শৈত্যপ্রবাহের পর ডিসেম্বরে আর শৈত্যপ্রবাহ কিংবা কুয়াশার চাদর দেখা যায়নি। তবে আজ থেকে কুয়াশার ঘনত্ব ও শীত উভয় বাড়বে। তবে সেটিও স্থায়ী হবে না। তিন দিন পর আবারও বাড়বে তাপমাত্রা।
আজ বুধবার থেকে কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা বাড়বে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়বে। একই সঙ্গে শীতের তীব্রতাও বাড়বে। তবে এই শীত ও কুয়াশা তিন-চার দিন পর কেটে যাবে এবং তাপমাত্রা আবার বাড়বে।’
তিন-চারদিন পর তাপমাত্রা আবার বাড়বে কেন? এই প্রশ্নের জবাবে আবদুর রহমান বলেন, ‘সাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। আর সেই লঘুচাপের প্রভাব পড়বে সারা দেশের আবহাওয়ায় এবং তখন তাপমাত্রা একটু বাড়তে থাকবে। এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে প্রায় ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর আবারও কমবে তাপমাত্রা।’
এবারের শীতে এই লঘুচাপ একটি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। গত ১ ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘ফিনজাল’ ভারতের তামিলনাড়ুতে আঘাতের পর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে আরও একটি লঘুচাপ নিম্নচাপে রূপান্তরিত হওয়ায় তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। আর এ কারণে ১৩ ডিসেম্বর দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পর তাপমাত্রার পারদ আর নিচে নামেনি বলে জানান আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ‘এবারের শীতে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। ডিসেম্বরে যেমন লঘুচাপ-নিম্নচাপের কারণে দেশের তাপমাত্রা যেভাবে কমার কথা ছিল সেভাবে কমেনি। তেমনি জানুয়ারিতেও একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে বঙ্গোপসাগরে। এই লঘুচাপের প্রভাব থাকে সারা দেশের আবহাওয়ায়।’
আসছে কুয়াশার চাদর : ঘন কুয়াশার কথা গত ডিসেম্বরে দেখা দিতে পারে বলে বলা হয়েছিল। কিন্তু তা এবার বছরের শুরুতে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে দেশের উত্তরবঙ্গে কুয়াশার প্রভাব শুরু হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি এখন গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর নাটোরে অবস্থান করছি। এখানে শীতের তীব্রতা সোমবার থেকে বেড়েছে এবং সেই সঙ্গে কুয়াশাও বেড়েছে।’ হিমালয়ান অঞ্চল থেকে ভারতের উত্তর প্রদেশ ও দিল্লি হয়ে কুয়াশার একটি বেল্ট তৈরি হয়েছে বলে জানান ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ। তিনি বলেন, ‘এই কুয়াশার চাদরের প্রভাবে আমাদের দেশে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়বে এবং শীতের তীব্রতা বেড়ে আসবে। যদিও তিন-চার দিন পর কুয়াশা কেটে গিয়ে আবারও তাপমাত্রা বাড়তে পারে। তবে তাপমাত্রা বাড়ার কয়েকদিন পর আবারও তাপমাত্রা কমে আসবে।’
বাড়বে শীতের তীব্রতা : জানুয়ারি মাস দেশের সবচেয়ে শীতলতম মাস উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডিসেম্বরে হয়তো শীত বেশি দেখা না গেলেও জানুয়ারিতে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে। আর সাগরের লঘুচাপ বা নিম্নচাপ আবহাওয়ায় টানা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।’
দেশের ৪৩ বছরের উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করে ‘চেঞ্জেস ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিলেও জানুয়ারি মাসে শীতের তীব্রতা বেশি থাকবে। গত বছরের মতো এবারও ভোগাবে কুয়াশা। দিনের দৈর্ঘ্য কম থাকায় সূর্যের আলো কম পাবে এবং দিনের তাপমাত্রা কমে আসবে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে এলে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেশি না কমলেও শীতের অনুভব বেশি থাকবে।’
উল্লেখ্য, কোনো অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। আর যদি তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন ওই এলাকায় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে তখন তীব্র শৈত্যপ্রবাহ প্রবাহিত হয়ে থাকে। দেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও জানুয়ারিতে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এ সময়ে সাধারণত উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল বাতাস প্রবেশ করে।