গতির তোড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীবাহী পরিবহন, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ছোট-বড় ট্রাকসহ সব যানবাহনই চলছে ঘোড়ার গতিতে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। কখনো ১০০’র বেশি গতি নিয়ে যাত্রীবাহী পরিবহনের সামনে এসে যায় মোটরসাইকেল। বারবার হর্ন দিলেও সাইট দেয় না। এমন গতির পাল্লা দিয়ে এই সড়কে যানবাহনগুলো চলছে প্রতিনিয়ত। এতেই বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ। গত এক সপ্তাহে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে আটটি দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

চার লেনের এই সড়কে গতিসীমা ৮০ দেওয়া থাকলেও কোনো গাড়ির গতি যেন ১২০-এর নিচে নামে না। অন্য গাড়িকে সাইট না দেওয়া, হর্ন বাজিয়ে ওভারটেক করে চলে যাওয়া এখানকার গাড়িগুলোর নিত্যদিনের চিত্র। আবার মোটরসাইকেলে বেপরোয়া গতিতে দুই-তিনজন নিয়ে অহরহ চলছে এই সড়কে। পদ্মা সেতু হওয়ায় শুক্র ও শনিবার যেন ঈদের ছুটি মেলে পদ্মার ওই পাড়ের মানুষের মনে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার যেন রাজত্ব চালায় ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে।

কোনোভাবেই শৃঙ্খলা ফিরছে না ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে। চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোসহ নানা কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ। রাস্তা পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ততম এই সড়ক পারাপার হচ্ছেন। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে এখন যেন মৃত্যুফাঁদ। একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে কী কী করণীয় জানতে চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের মনিটরিং বাড়াতে হবে। হাইওয়ে পুলিশের সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করতে হবে। এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজার আগে কুসন (কংক্রিট ও রাবারের তৈরি ব্যারিকেড) বসাতে হবে। স্পিড ক্যামেরা বসাতে হবে। সর্বোপরি সব যানবাহনের ফিটনেস সঠিকভাবে থাকতে হবে। মালিকদের দেখতে হবে চালক মাদকমুক্ত কি না এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

গত ২২ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আলাদা ছয়টি স্থানে ১৩টি যানবাহনে দুর্ঘটনায় একজন নিহত ও ২১ জন আহত হন। পাঁচটি দুর্ঘটনাই ঘন কুয়াশার কারণে। পরদিন ২৩ ডিসেম্বর ঘন কুয়াশার ধলেশ্বরী-২ সেতুর ওপর প্রাইভেট কার ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। গত ২৭ ডিসেম্বর প্রাণ হারালেন আরও ছয়জন। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে আটটি দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। সরকারি হিসেবে ৫৫ কিলোমিটারের এক্সপ্রেসওয়েটিতে সব মিলিয়ে ৯৮৫টি দুর্ঘটনায় ১৩৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই প্রাইভেট কার, কাভার্ড ভ্যান ও যাত্রীবাহী পরিবহন। তবে মোটরসাইকেলও অতিরিক্ত গতির কারণে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আইন অমান্য করে চালকের বেপরোয়া গতি আর অদক্ষতায় বাড়ছে দুর্ঘটনা। এ ছাড়া লোকাল বাস, আন্তঃজেলার বাসগুলো মহাসড়কের যেখানে-সেখানে থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। গতিসীমার তোয়াক্কা নেই চালকদের। এ ছাড়া শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশায়ও দুর্ঘটনা বেড়েছে আরও। এ সময়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালানো ও সড়কবাতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যাত্রী ও চালকদেরও সচেতনতার চেষ্টা করছে পুলিশ।

পরিবহন চালকরা বলছেন, এ সড়কে যেকোনো গাড়ি উঠলেই বেপরোয়া হয়ে যায়। যাত্রীরা নিজ স্থানে নামতে বাস স্টপেজে নামেন না, গাড়ি দাঁড়াতে দেন না। আবার বাস থামার জন্য যে স্থান রয়েছে সেখানে একটা আইল্যান্ড থাকায় কোনো গাড়িই ভেতরে থামে না। সবমিলিয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রী ওঠানামার জন্য যে স্থানগুলো করা হয়েছে সেগুলো কোনো কাজেই আসছে না। এ ছাড়া রাতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল। কোনো পরিবহনকে সাইট দেয় না। প্রতিটি গাড়ির স্পিড যেন ১৫০ থেকে ১৬০ থাকে। যার ফলে এ সড়কে দুর্ঘটনা ঘটে।

দেশের প্রথম এই এক্সপ্রেসওয়ে যোগাযোগে নতুনমাত্রা যুক্ত করলেও ক্রমেই দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে ওঠায় যাত্রীদের মাথায় চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। প্রশস্ত সড়ক, ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস, ইন্টারচেঞ্জ, ধীরগতির গাড়ির জন্য আলাদা সার্ভিস সড়ক থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনার হটস্পট এখন এক্সপ্রেসওয়ে। ফায়ার সার্ভিস বলছে, বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তবে যাত্রী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশ ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অবহেলায় বাড়ছে দুর্ঘটনা।

এক্সপ্রেসওয়েতে রাকিব হাসান নামে এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, এখানে সর্বোচ্চ গতিবেগ ৮০ হলেও গাড়ি চালানো হয় ১০০’র ওপরে। দোলা পরিবহনের বাসচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, এই সড়কে সবাই যেন বেপরোয়া। কেউ কারও হর্ন শোনে না, কার আগে কে যাবে সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন সব চালকরা। মোটরসাইকেল হুটহাট করে সামনে চলে আসে। ছোট পিকআপভ্যান এক লেন থেকে অন্য লেনে চলে আসে। ১২০-এর গতির গাড়ি হঠাৎ কোনো স্থানে ব্রেক করলে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। তাই সবাইকে সচেতন হয়ে গাড়ি চালাতে হবে। তাহলেই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মনি করি, বেপরোয়া গতির কারণেই এত দুর্ঘটনা ঘটছে। যেহেতু এখন কুয়াশা পড়ছে তাই গতি কমানো না গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়বে। এ ছাড়া যানবাহনগুলো যদি এক্সপ্রেসওয়ের সঠিক ট্রাফিক আইন মানে তাহলে এখানকার দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে আশা করছি।

প্রতিটি দুর্ঘটনাই আলাদা উল্লেখ করে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এইচআর এবং মিডিয়া) শ্যামল কুমর মুখার্জী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে অসচেতনতা। গাড়ির অতিরিক্ত গতি, একই স্থানের গাড়ির মধ্যে প্রতিযোগিতা, বেপরোয়া চালকসহ বিভিন্ন কারণে এখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশ রাতে ও দিনে চেকপোস্ট বসান, স্পিডগান দিয়ে গাড়ির গতি নির্ধারণ করা হয়, প্রায়ই সচেনতামূলক ক্যাম্পেইনসহ সচেতনমূলক বিভিন্ন কাজ করা হয়। তারপরও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চলাচল করায় দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে। এই সড়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চালকদের সচেতনতা। এ ছাড়া মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ ছোটবড় সব যানবাহনই সচেতনভাবে চালকরা চলালে দুর্ঘটনা কমবে। এ ছাড়া জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম আইটিএসের আওতায় ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এক্সপ্রেসওয়ে মনিটরিংয়ের চেষ্টা চলছে।

দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশের ক্যাম্পেইন : গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের হাঁসাড়া হাইওয়ে এলাকায় দুর্ঘটনা রোধে ক্যাম্পেইন করে হাইওয়ে পুলিশ। এ সময় গাজীপুর রিজিওন হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি ডা. আ ক ম আখতারুজ্জামান বসুনিয়ার নেতৃত্বে মাইকিং, চালক ও যাত্রীদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা হয়। সে সময় আখতারুজ্জামান বলেছিলেন, শীতকালে সাধারণত ঘন কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনার প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে যাত্রী এবং চালকদের সচেতন করা হয়। বেপরোয়া গতিতে যান চলাচলের কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এই দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করার জন্যই রাত-দিন হাইওয়ে পুলিশ কাজ করে।