হাজীগঞ্জের ঐতিহাসিক বড় মসজিদ

দেশের সর্ববৃহৎ মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ। ঐতিহাসিক এই মসজিদটি অন্যতম মুসলিম নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। মসজিদটির নির্মাণকালে স্থাপত্যশিল্পের যে নির্মাণশৈলী দেওয়া হয়েছে, তা যেন স্থাপত্যশিল্পেরই বিশুদ্ধ ব্যাকরণ। ১৩২৫ থেকে ১৩৩০ বঙ্গাব্দের মধ্যে নির্মিত এ মসজিদের বিভিন্ন অংশে যে কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা কালের সাক্ষ্য বহন করছে। প্রথমে একচালা খড়ের ইবাদতখানা, পরে খড় ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি দোচালা মসজিদ নির্মাণ করা হয়। যা পরে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১৭ আশ্বিন আহমদ আলী পাটওয়ারী (রহ.)-এর পরম ইচ্ছায় হজরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.) পবিত্র হাতে পাকা মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মসজিদের ফটকটি চমৎকার কারুকার্য খচিত। মসজিদের প্রবেশের সুবিশাল এই ফটকটি মন কেড়ে নেয় যেকোনো দর্শনার্থীর। দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। আর বাংলাদেশের জুমাতুল বিদার সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় এই মসজিদে। পাথরের সাজে সজ্জিত অসংখ্য তারকাখচিত তিনটি বড় বড় গম্বুজ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ২৮ হাজার ৪০৫ বর্গফুটের এ মসজিদে জুমার নামাজের আজান ও ইকামতের উদ্বোধনী দিবসে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ চারজন মন্ত্রী এসেছিলেন। এ মসজিদে নামাজ পড়েছিলেন জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ অনেকে। বিভিন্ন সময় এসেছেন বরেণ্য আউলিয়ারাও।

চাঁদপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জনপদ হাজীগঞ্জ উপজেলা। আল্লাহর ওলিদের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হজরত মনিরুদ্দিন মনাই হাজী (রহ.)-এর দৌহিত্র আহমদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ও হজরত মকিম উদ্দিন (রহ.)-এর নিজ বাসস্থান বাগানবাড়িতে প্রথমে একচালা খড়ের তৈরি মসজিদ নির্মাণ করেন। একপর্যায়ে আহমদ আলী পাটোয়ারী (রহ.) তার দেখা স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় আকারে মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি নিজেই ইটভাটা তৈরি করেন এবং ৭৭টি আকর্ষণীয় পিলারের ওপর মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ঝিনুকের মোজাইক বেষ্টিত পিলার, নিখুঁত নকশার কারুকাজে সাজানো মসজিদের ভেতর-বাইরের দেয়ালগুলো দেখতে খুবই অসাধারণ লাগে। ১২৮ ফুট উঁচু একটি মিনার রয়েছে। সুউচ্চ এই মিনারটিরও আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। মসজিদটির মেহরাবও তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন কারুকার্য করে। ধর্মীয় শিক্ষাদানের উদ্দেশে মসজিদের পূর্ব পাশে রয়েছে কামিল মাদ্রাসা। শত বছরেরও বেশি দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটির নির্মাণশৈলী একনজর দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক। মিনারের উঁচু প্ল্যাটফর্মে বহু মুসল্লি ও পর্যটক উঠে হাজীগঞ্জের চারপাশের দৃশ্য অবলোকন করেন। নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা। উল্লেখ্য, মসজিদটি পরিচালনার জন্য রয়েছে ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ এবং এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর মোতাওয়াল্লি হিসেবে রয়েছেন মসজিদের প্রতিষ্ঠাতার বংশধর ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবির পাটোয়ারী।

যেভাবে যাবেন, দেশের যেকোনো স্থান থেকে সড়ক, নৌ ও রেলপথে চাঁদপুর এসে হাজীগঞ্জ বাজারের চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কের পাশেই ঐতিহাসিক এই মসজিদের অবস্থান। রেলপথে আসলে লাকসাম রেলওয়ে জংশন থেকে রাত ৮টায় আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেন ও সকাল সাড়ে ১১টায় সাগরিকা ট্রেন চাঁদপুরের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। পথিমধ্যেই হাজীগঞ্জ রেলস্টেশনে নেমে ইজিবাইক কিংবা সিএনজিযোগে ১০ টাকা দিয়ে মসজিদের সামনে এসে নামা যায়।