ঢাকা-বরিশাল নৌপথে কেবিন সংকট চরমে পৌঁছেছে। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, এই সংকটের মূল কারণ বিশাল একটি কালোবাজারি সিন্ডিকেট। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে দাবি করছে, শীত মৌসুমে লঞ্চ ভ্রমণের জনপ্রিয়তা এবং সড়কপথে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণে যাত্রীরা নৌপথে বেশি ঝুঁকছেন। ফলে ঘাটে লঞ্চের সংখ্যা কম থাকায় সীমিত কেবিন দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
যাত্রীদের ভাষ্যমতে, লঞ্চ ছাড়ার দিন বুকিং অফিসে বা সরাসরি লঞ্চে গিয়ে কেবিন পাওয়া যায় না। আগে থেকেই একটি কালোবাজারি চক্র পুরো কেবিন বুকিং করে নেয় এবং পরে তা দ্বিগুণ বা তার বেশি দামে বিক্রি করে। এতে যাত্রীরা আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে একাধিক যাত্রী লঞ্চ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, লঞ্চ মালিক ও সিন্ডিকেটের মধ্যে যোগসাজশের কারণে এই কালোবাজারি কার্যক্রম অবাধে চলতে পারছে।
তীব্র এই সংকট সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীরা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং লঞ্চ কর্তৃপক্ষের নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই কালোবাজারি বন্ধ করা না হলে নৌপথে যাতায়াত আরও জটিল হয়ে উঠবে। লঞ্চ যাত্রী আল-আমিন জানান, হঠাৎ ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে সুন্দরবন লঞ্চের বুকিং অফিস এবং সরাসরি লঞ্চে গিয়েও তিনি একটি ডাবল বা সিঙ্গেল কেবিন পাননি। ওই দিন সুন্দরবন কোম্পানির তিনটি লঞ্চ ঘাটে ছিল, যার একটি ঝালকাঠি হয়ে বরিশালে পৌঁছেছিল। তবুও কোনো কেবিন স্বচ্ছভাবে পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘ঘাটে অনেক সময় ধরে খোঁজখবর করে কালোবাজারি সিন্ডিকেটের কাছ থেকে একটি সিঙ্গেল কেবিন পাই। ওই সিন্ডিকেটের কাছে ১০টি কেবিন ছিল, যার একটি আমি দ্বিগুণ দামে কিনতে বাধ্য হই।’
আরেক যাত্রী মো. সেলিম জানান, দুদিন আগে থেকেই যোগাযোগ করেও কোনো কেবিন পাননি। তিনি বলেন, ‘ডেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কিন্তু প্রচন্ড ঠান্ডার কারণে ঘাটে বসে স্টাফ ও ঘাটের লোকজনের কাছে খোঁজাখুঁজি করে শেষ মুহূর্তে একটি কেবিন ম্যানেজ করি। যার মূল্য ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা।’ তার অভিযোগ, ‘লঞ্চ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, লঞ্চ কম থাকায় কেবিন সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেরাই এই সংকট তৈরি করেছে। এখানে একটি বড় কালোবাজারি সিন্ডিকেট সক্রিয়। কিছু কেবিন নিয়ম মেনে বিক্রি হলেও বাকি অধিকাংশ কেবিন কালোবাজারির মাধ্যমে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।’
প্রিন্স আওলাদ লঞ্চের বরিশাল বুকিং অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা অভিজিৎ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে যানজট, দুর্ঘটনা, স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় ডিসেম্বর মাসে লঞ্চে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। সেই যাত্রী চাপ এখনো রয়েছে। তবে কেউ যদি বেশিসংখ্যক কেবিন বুকিং নিয়ে তাহলে তাকে যাচাই-বাছাই করে কেবিন বুকিং দেওয়া হয়। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ কেবিন বুকিংয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বুকিং অফিস থেকে অর্ধেক আর লঞ্চ থেকে অর্ধেক কেবিন বুকিং দিয়ে থাকি। আর কেউ যদি বেশি কেবিন বুকিং নেয় তার মোবাইল নম্বরসহ অন্যান্যভাবে আমরা যাচাই করে বুকিং দিয়ে থাকি। এ ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি, যাতে যাত্রী হয়রানি না হয়।’
পারাবাত লঞ্চের কেরানি তুহিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। আমাদের লঞ্চ মাসে মাত্র পাঁচটি ট্রিপ পায়। যদি প্রতিদিন ট্রিপ দেওয়া যেত, তাহলে যাত্রীদের প্রকৃত চাপ বোঝা যেত। এখন লঞ্চ কম চলাচলের কারণে কিছুটা চাপ থাকতে পারে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, বিকেল থেকেই ঢাকা নদীবন্দরে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। কেবিন না পেয়ে অনেক যাত্রী অসহায়ভাবে ডেকে বসার জায়গা খুঁজছেন। লঞ্চের স্টাফদের ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য যাত্রীদের এই ভোগান্তি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। লঞ্চের ডেকে তোশক বিছিয়ে যাত্রীদের থেকে ২০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ডেকে বসার জায়গা না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়েই এই জায়গা কিনছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কালোবাজারি সদস্য বলেন, ‘আমরা ঘাটে থাকি। আগের মতো আয়-রোজগার নেই। তাই ১০-২০টি কেবিন বিক্রি করতে পারলে কিছু টাকা ইনকাম করা যায়।’
সুন্দরবন লঞ্চের এক স্টাফও নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, ‘লঞ্চের ডেকে অনেক জায়গা থাকে। আমরা তোশক বিছিয়ে আলাদা আয় করি। যাত্রীরা খুশি হয়ে আমাদের কাছ থেকে তোশক ভাড়ায় নেয়।’
এ বিষয়ে জানতে বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।