ওলামায়ে কেরামের মর্যাদা

জগতের শ্রেষ্ঠসন্তান আলেম সমাজ। সাধারণ মানুষ আলেমদের অনুসরণ-অনুকরণকেই আখেরাতের মুক্তির পাথেয় মনে করে। আলেমদের মর্যাদা সম্পর্কে কোরআন-সুন্নাহে এত এত গুরুত্ব এসেছে যে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আলেমদের প্রতি মহব্বত রাখা সৌভাগ্য মনে করতে বাধ্য হয়েছে। আলেমদের মর্যদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শুনে রাখো! যে ব্যক্তি জ্ঞান সংগ্রহে পথ চলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। কোনো জ্ঞানী যখন জমিনে পা রাখে ফেরেশতারা তার সম্মানে নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন। জ্ঞানীর জন্য প্রতিটি প্রাণী এমনকি সাগরের মাছ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনা করে। লক্ষ তারার চেয়ে চাঁদের আলো যেমন বেশি উজ্জ্বল, তেমনি ইবাদতে মগ্ন হাজারো ব্যক্তির চেয়ে একজন জ্ঞানী আল্লাহর কাছে অনেক বেশি দামি।’ (আবু দাউদ) আলেমদের চলার পথে ফেরেশতারা পাখা বিছিয়ে দেন জানতে চাইলে এক আল্লাহর অলি বলেন, ‘খোদা তায়ালার সৃষ্টিরাজ্যে একমাত্র আলেমরাই রাজকীয় মেহমান। সুরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জেনে রাখো! আমার বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেম সমজাই আমাকে ভয় করে।’

আলেমরা হলেন নবীদের ওয়ারিশ। ওহি প্রেরণ করার মাধ্যমে নবী-রাসুলদের আল্লাহতায়ালা সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছেন। নবী-রাসুলদের সেই ওহির এলেমের উত্তরাধিকারী হলেন আলেমরা। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। নবীরা দিনার বা দিরহামকে উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যান না। বরং তারা রেখে গিয়েছেন কেবল এলেম। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করেছে, সে বড় কিছু গ্রহণ করেছে।’ (আবু দাউদ) আলেমদের মর্যাদা বেশি হওয়ার কারণ হলো, তাদের কাছেই মানুষ লাভ করে কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান। চিনতে পারে প্রভুকে। মানুষ খুঁজে পায় নিজের আসল পরিচয়। শিখতে পারে আল্লাহর বিধিবিধান। জানতে পারে হালাল-হারাম। তাদের সংস্পর্শে এসেই অন্ধকার জগতের মানুষ সন্ধান পায় আলোকিত জীবনের। মৃত হৃদয়গুলো হয় পুনরুজ্জীবিত। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে উন্মত্ত মানুষ আখেরাতমুখী জীবন ধারণ করে। তারা পৃথিবীর জন্য রহমত। তারা উম্মতের জন্য বরকত। পরমহিতৈষী ও মঙ্গলকামী। তাদের কাছে ইসলাম সবার আগে। আল্লাহতায়ালা আলেমদের বানিয়েছেন নিজ একত্ববাদের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা ও ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮)

কোরআনে আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আলেমদের আনুগত্য করার জন্যও। আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, অনুসরণ করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্র্তৃত্বসম্পন্ন ন্যায়পরায়ণ (আলেম) আছে তাদের।’ (সুরা নিসা ৫৯) শরিয়তের যেকোনো সমস্যা নিরসনে তাদের দ্বারস্থ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা নিজেই। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘অতএব জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমাদের জানা না থাকে।’ (সুরা নাহল ৪৩)

একজন আলেম দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে গেলে মানুষ যেমন দিশেহারা হয়ে যায়, ঠিক তেমনি কোনো আলেম চলে গেলে পুরো দেশ ও সমাজ অচল হয়ে পড়ে। যেহেতু ওলামায়ে কেরাম না থাকলে দ্বীনের চর্চা বন্ধ হয়ে যাবে, পৃথিবীর সব মানুষ মনুষ্যত্ব ভুলে চতুষ্পদ জন্তুতে পরিণত হবে, তাই আলেমকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। অন্য দিকে জ্ঞানীদের প্রতি অবজ্ঞা বা ধৃষ্টতা প্রদর্শন করলে, তাদের নিয়ে উপহাস বা ঠাট্টা করলে বা বিশ্রী ভাষায় গালাগালি করলে এর পরিণতিও ভয়ংকর। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে একটি চমৎকার হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে দুশমনি রাখবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করব।’ (সহিহ বুখারি)