দুদকের আপত্তির পরও শরিফুল পাচ্ছেন দায়িত্ব!

দুর্নীতি দমন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা আর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমন্বয়কদের আপত্তির পরও পদোন্নতি ও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব পাচ্ছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম। গত মাসের শেষদিকে একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতি দিয়ে তাকে থার্ড টার্মিনালের ডিপিডি এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিউএসএস বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন আবার তাকে দেশের অন্য সব অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরেরও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পিঅ্যান্ডডি/কিউএস) বানানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অথচ তার বিরুদ্ধে গেট কেলেঙ্কারি মামলায় ১ কোটি টাকার দুনীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের বিমানবন্দরগুলো হচ্ছে কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) স্থাপনা। এসব স্থাপনা ব্যবহার করে দেশের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করেন। স্পর্শকাতর এসব স্থাপনায় সাধারণত বিতর্কিত নন, এমন কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেওয়ার নিয়ম। অথচ বেবিচক কর্তৃপক্ষ সবকিছু জেনেশুনে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসাচ্ছেন। তারা আরও বলেছেন, শরিফুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তাকে এসব পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

জানা গেছে, প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির মামলা তদন্তাধীন আছে কি না, জানতে দুদকে চিঠি দিয়েছিল। দুদক পাল্টা চিঠিতে তাকে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না বলে বেবিচককে জানায়। এরপরও তাকে রহস্যজনক পদোন্নতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমন্বয়করা জানিয়েছেন, বেবিচকের বিতর্কিত কর্মকর্তা প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের বাবা গোপালগঞ্জের মোশারফ হোসেন আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। অভিযোগ আছে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে শরিফুলের আয়ের একটি বড় অংশ তার বাবা মোশারফ হোসেনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আন্দোলনে ব্যয় হতো।

গত আগস্ট বিপ্লবের আগে-পরেও গোপালগঞ্জে ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে হামলা নির্যাতনে শরিফুল ইসলামের বাবা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বিপুল অঙ্কের টাকা ঢেলেছেন। শরিফুলের বাবা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিটিং-সিটিংয়ে বলতেন, তার ছেলেকে ২০০১ সালে শেখ হাসিনা চাকরি দিয়েছেন। শেখ হাসিনার জন্য তিনি সবকিছু করবেন।

অভিযোগ আছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম কোনো দিন অফিস করতেন না। মাসের বেশিরভাগ সময় তিনি অফিসের বাইরে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে কাটাতেন। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় এবং বাবা আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ ভয়ে আঙুল তুলতেন না। বেবিচকের প্রশাসন বিভাগের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, এর আগেও দুদকের নিষেধাজ্ঞা আমান্য করে আরেক প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছেন। ওই কর্মকর্তার নাম প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান। এ হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ বর্তমানে ফাইলবন্দি হয়ে আছে। হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও বেবিচকে বিভাগীয় মামলা রয়েছে। জানা গেছে, এ হাবিবুর রহমান প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পরপরই বেবিচকে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে।

শরিফুল ইসলামকে যেভাবে দুদকে তলব : সিভিল অ্যাভিয়েশনের বিভিন্ন প্রকেল্পের টাকা আত্মসাৎ, মেইনটেন্যান্স, কনস্ট্রাকশন, কেনাকাটা ও ফান্ড ম্যানেজমেন্টে কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়ম, দুর্নীতি, আত্মসাৎ অভিযোগে বেবিচকের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামসহ ছয়জনকে দুদকে তলব করা হয়েছিল। গত বছর দুদক থেকে এ তলবের নোটিস পাঠানো হয়। দুদকের তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষর করা এক নোটিসের মাধ্যমে এ তথ্য পাঠানো হয়।

নোটিসে গত বছর ২০ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি শরিফুল ইসলামকে দুদকে হাজির হতে বলা হয়। দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে অনুসন্ধান টিমের অন্যান্য সদস্য ছিলেন উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান ও সহকারী পরিচালক মো. আতাউর রহমান সরকার। অভিযোগ আছে, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর সঙ্গে যোগসাজশে সংস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ, ক্রয় এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ আছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, দুদকের একটি সিন্ডিকেট মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে গত বছর ১৯ অক্টোবর সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী, প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামসহ সবাইকে দায়মুক্তি দেয়। ‘নথিভুক্তি’র খাতাতে স্বাক্ষর করেন মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান। এ ছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গেট ও ওয়েটিং রুম নির্মাণে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করে দুদক। এ ঘটনায়ও বেবিচকের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামসহ চার প্রকৌশলীকে অভিযুক্ত করা হয়। টাকা আত্মসাতে জড়িতদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, শরিফুল ইসলাম সিন্ডিকেট তৎকালীন বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল মালেককে মোটা অঙ্কের ঘুষ তার দপ্তর থেকে এ-সংক্রান্ত দুর্নীতির নথি গায়েব করে দেন। এ কারণে বেবিচক গঠিত তদন্ত কমিটি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযুক্তদের বাঁচাতেই নথিগুলো চুরি করা হয়েছিল। জানা গেছে, সিভিল অ্যাভিয়েশন মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি ও দুদকের নির্দেশে গেট নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ও অন্যদের সম্পর্কে তথ্য ও ফাইল চেয়ে সে সময় প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দেন বেবিচকের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) জহিরুল ইসলাম। চিঠিতে বলা হয়, বিমানবন্দরে তত্ত্ববাবধায়ক প্রকৌশলীর (পিঅ্যান্ডডি/কিউএস) কার্যালয়ের গেট ও ওয়েটিং রুম নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথমবার চিঠি দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় নথি না দেওয়ায় আবার তাগাদা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এভাবে মোট চারবার চিঠি দেওয়া হলেও দুর্নীতির তথ্য ও দলিলপত্র দেওয়া হয়নি। পরে বেবিচকের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল ডিভিশন-২) এবং সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (সিভিল ডিভিশন-২) স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে পরিচালক প্রশাসনকে জানানো হয়, গেট নির্মাণে কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির পুরনো ওই ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর পরই নথি গায়েব হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।

বেবিচকের একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, গেট নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি ও কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত শরিফুলসহ অন্যান্য প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা হলে ২২ লাখ টাকা ফেরত দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে প্রমাণ হয়, ওই গেট নির্মাণে বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে।

২০১৭ সালে শাহজালালে সিভিল সার্কেলের প্ল্যানিং অ্যান্ড ডিজাইন কোয়ালিটি সার্ভিসের প্রবেশ পথে একটি গেট নির্মাণ করা হয়। ওই গেট নির্মাণের সঙ্গে অর্থ ব্যয়ের কোনো মিল নেই। এ গেট নির্মাণের মূল ডিজাইন ও আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম। তার নেতৃত্বে অসাধু ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের যোগসাজশে দুর্নীতি করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক মো. আশিকুর রহমান গেট নির্মাণে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান ও জহির উদ্দিনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দুদকে সরবরাহ করার জন্য বেবিচককে চিঠি দেন।