মক্কা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন নগরী। উম্মুল কুরা বা জনপদগুলোর মা বলা হয় পবিত্র এই নগরীকে। সম্মানিত ও পবিত্র এই নগরীকে কোরআনে কারিমে নিরাপদ নগরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা কাবাকে নিজের ঘর বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রতিদিন আমরা কাবার দিকে মুখ করেই নামাজ আদায় করি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, নিজেদের আবেদন-নিবেদনের কথা জানাই। এই ঘরের দিকে ফিরে নামাজ না পড়লে কখনোই নামাজ শুদ্ধ হবে না। পবিত্র কাবা ঘর সর্বপ্রথম আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় নির্মাতা আদম (আ.)। নুহ (আ.)-এর সময় প্লাবনে আদম (আ.)-এর নির্মিত কাবা ভবন বিলীন হয়ে যায়। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আমলে সেটার কোনো নিদর্শন অবশিষ্ট ছিল না। ইব্রাহিম (আ.)-কে আল্লাহতায়ালা ওহির মাধ্যমে প্রাচীন ভিত সম্পর্কে জানিয়ে দেন এবং নতুন করে প্রাচীন ভিতের ওপর কাবা নির্মাণের নির্দেশ দেন। ইব্রাহিম তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে এই পবিত্র ঘর নির্মাণ শুরু করেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘(স্মরণ করুন) যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল কাবাগৃহের ভিত্তি তুলছিল, তখন প্রার্থনা করল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।’ (সুরা বাকারা ১২৭)
কাবা নির্মাণ শেষে ইব্রাহিম (আ.) মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় অনাগত বহু মানুষ লাব্বাইক বলে সাড়া দেন। সেদিন যারা লাব্বাইক বলেছিল পৃথিবীতে বাইতুল্লাহর হজ তাদের নসিব হয়েছে এবং হবে। (ইবনে কাসির)
ইব্রাহিম (আ.)-এর নির্মাণের পরও বহুবার এই ঘরের নির্মাণ ও সংস্করণ করা হয়। কোনো এক সময় কাবা ঘর ধসে পড়লে আমালেকা সম্প্রদায় নির্মাণ করে। এরপর ধসে গেলে বনু জুরহুম গোত্র নতুন করে কাবা নির্মাণের সৌভাগ্য লাভ করে। পরবর্তী সময় কুরাইশ বংশের লোকেরা কাবা নির্মাণ ও সংস্কার করে। কাবা সংস্কারের কাজকে কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়। বনু আবদে মানাফ ও বনু জুহরা দরজার দায়িত্ব নেয়। বনু মাখজুম ও অন্যান্য কয়েকটি গোত্র একত্রে রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমেনির মধ্যবর্তী অংশ সংস্কারের দায়িত্ব নেয়। বনু জুহমা ও সাহমাকে ছাদ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বনু আবদুদ দার, বনু আসাদ এবং বনু আদি বিন কাব হাতিমের অংশ সংস্কারের দায়িত্ব নেয়। (সিরাত ইবনে হিশাম)
ইব্রাহিমি ভিতে হাতিম কাবার মূল দেয়ালেরই অংশ ছিল। কিন্তু বৈধ অর্থের সংকটে কুরাইশরা হাতিমের দেয়াল নির্মাণ করতে সক্ষম হয়নি। এ নির্মাণকালে কুরাইশরা আরও একটি সংস্কারমূলক কাজ করে। আগে কাবার দুটি দরজা ছিল। একটি পশ্চিম পাশে, অপরটি পূর্ব পাশে। কুরাইশরা পশ্চিম পাশের দরজাটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। নির্মাণ শেষে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে পরস্পর মতবিরোধ দেখা দেয়। এ অবস্থায় কয়েক দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। একপর্যায়ে তারা কাবা প্রাঙ্গণে আলোচনা ও পরামর্শ করে বলে, আগামীকাল যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কাবা ঘরে প্রবেশ করবে, সে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। পরদিন রাসুল (সা.) সর্বপ্রথম কাবায় প্রবেশ করেন। রাসুল (সা.)-কে দেখে সবাই বলে এ তো আল-আমিন, আমরা তার সিদ্ধান্ত মেনে নেব। নবুওয়াতের পূর্বে কুরাইশরা রাসুল (সা.)-কে আল-আমিন (বিশ্বস্ত) নামে ডাকত।
রাসুল (সা.)-কে তারা নিজেদের মতবিরোধের কথা জানায়। তিনি তাদের একটি চাদর নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। চাদর আনা হলে তিনি নিজ হাতে পাথরটি চাদরে রেখে প্রত্যেক গোত্র প্রধানকে চাদরের একাংশ ধরে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দিষ্ট স্থানে পাথর নিয়ে গেলে তিনি নিজ হাতে পাথর প্রতিস্থাপন করেন।
ইব্রাহিম (আ.) যেভাবে কাবা নির্মাণ করেছিলেন, এবার কুরাইশদের নির্মাণের সময় তা থেকে সামান্য পরিবর্তন হয়ে যায়। ‘হাতিম’ কাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর ইব্রাহিম (আ.)-এর নির্মাণে কাবাগৃহের দরজা ছিল দুটি, একটি প্রবেশের জন্য, অন্যটি বের হওয়ার জন্য। কিন্তু কুরাইশরা শুধু পূর্বদিকে একটি দরজা রাখে। এ ছাড়া তারা সমতল ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে দরজা নির্মাণ করে, যাতে সবাই সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। বরং তারা যাকে অনুমতি দেয় সেই যেন প্রবেশ করতে পারে।
রাসুল (সা.) একবার আয়েশা (রা.)-কে বলেন, ‘আমার ইচ্ছা হয়, কাবাগৃহের বর্তমান নির্মাণ ভেঙে দিয়ে ইব্রাহিমের নির্মাণের অনুরূপ করে দিই। কিন্তু কাবাগৃহ ভেঙে দিলে নতুন মুসলিমদের মনে ভুল-বোঝাবুঝি দেখা দেওয়ার আশঙ্কার কথা চিন্তা করেই বর্তমান অবস্থা বহাল রাখছি।’ আয়েশা (রা.)-এর ভাগ্নে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) মহানবী (সা.)-এর উপরোক্ত ইচ্ছা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের পর যখন মক্কার ওপর তার কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তিনি উপর্যুক্ত ইচ্ছাটি কার্যে পরিণত করেন এবং কাবাঘরের নির্মাণ ইব্রাহিম (আ.)-এর নির্মাণের অনুরূপ করে দেন।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরকে শহীদ করে এবং তার নির্মিত ভবন ভেঙে ৭৪ হিজরিতে কুরাইশদের ভিতের ওপর কাবা নির্মাণ করে। পরবর্তীতে এক ন্যায়পরায়ণ শাসক রাসুল (সা.)-এর মনোবাঞ্ছা পূরণে ইব্রাহিম (আ.)-এর ভিতে কাবা নির্মাণ করতে গেলে ইমাম মালেক (রহ.) এ বলে বারণ করেন যে, এভাবে বারবার কাবা নির্মাণ করা হলে প্রত্যেকেই তার কীর্তি রেখে যাওয়ার চেষ্টা করবে। ফলে এই পবিত্র গৃহের মর্যাদা ক্ষুণœ হবে। বর্তমানে কাবা হাজ্জাজের নির্মাণের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। তবে প্রতি বছর কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়।