বরিশালের ঐতিহ্যবাহী নদী কীর্তনখোলা। যে নদী রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় হয়ে আছে ধ্রুপদী এক নাম। সেই নদী ঐতিহ্য হারিয়ে এখন দূষণের শিকার হয়ে ধুঁকছে বিপন্নতায়। কলকারখানার বর্জ্যে প্রতিদিন নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। প্লাস্টিক ও বিষাক্ত বর্জ্য নদীর নাব্য কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। এ অবস্থায় পরিবেশবিদরা দূষণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে।
‘কীর্তনখোলা নদীকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, নইলে বরিশালের এই ঐতিহ্যবাহী নদী হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়।’ পরিবেশ উন্নয়ন (বাপা) সমন্বয়ক রফিকুল আলমের এই সতর্কবার্তা স্পষ্টতই এখন দৃষ্টি আকর্ষণ করছে কীর্তনখোলার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেল খাল, ভাটার খাল এবং ভিআইপি কলোনির ড্রেন থেকে সরাসরি টনকে টন বর্জ্য গিয়ে মিশছে কীর্তনখোলায়। কলকারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীর পানি বিষাক্ত করছে। আর নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো থেকে পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বর্জ্য জমে তলদেশে পলি হয়ে নদীর নাব্য হ্রাস করছে, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
বাজার রোডের বাসিন্দা হুমায়ন কবির বলেন, ‘আমাদের শৈশবের জেল খাল ও কীর্তনখোলা এখন শুধু ময়লার ভাগাড়। এই পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, এর দিকে তাকাতেও মন চায় না। খাল থেকে নদীতে যেভাবে ময়লা মিশছে, তা না দেখলে বোঝা যাবে না।’
বাংলাদেশ পরিবেশ উন্নয়ন সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলেন, ‘নদী দূষণ রোধে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ কার্যকর নয়। প্রতিটি নদীর জন্য একটি হেলথ কার্ড থাকা উচিত। নিয়মিত পরীক্ষা ও তদারকি হলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আমরা লঞ্চে প্রচারণা চালিয়েছি, ডাস্টবিন ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু বেশিরভাগ যাত্রী এবং লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তা মানছে না।’
বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘কীর্তনখোলা নদীকে দূষণ ও দখলমুক্ত করার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। দূষণকারীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। পরিবেশ রক্ষায় সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘নদী রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর একটি দূষণকারী তালিকা তৈরি করছে। দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য কীর্তনখোলাকে দখল ও দূষণমুক্ত করা।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শেখ কামাল মেহেদী বলেন, ‘কীর্তনখোলার দূষণ কমাতে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর প্ল্যান্ট তৈরি করা দরকার।
এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়ানো ও নদীর তীরবর্তী এলাকার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করা হবে।’
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় নাগরিকরা মনে করেন, কীর্তনখোলার মতো নদী বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগই একমাত্র পথ। আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা কীর্তনখোলার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে পারে। এখন প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেব, নাকি এই নদীকে হারানোর সাক্ষী হব?