দিন তারিখ ঠিক না হলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনেও তৎপরতা শুরু করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির অন্তত চার ডজন নেতা। নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি এলাকার সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তারা। দীর্ঘ সোয়া যুগ ধরে প্রতিকূল পরিবেশে ছন্নছাড়া হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের নিজস্ব বলয়ে আনার চেষ্টাও করে যাচ্ছেন এসব নেতা। এ নিয়ে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। কখনো কখনো তা রূপ নিচ্ছে সংঘাত-হানাহানিতে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের সময়ের বিগত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। আমরা আশা করছি, স্বৈরাচারমুক্ত পরিবেশে আগামীতে দেশের জনগণই ভোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন। একটি বড় দল হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপিতে প্রতিটি আসনে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকবে। সে হিসেবে তারা নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাখার চেষ্টা করে যাবেন। তবে, এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা মেনে নেওয়া হবে না।
তৃণমূলের বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, মামলা-হামলার ভয়ে দীর্ঘদিন দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় থাকলেও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সবাই এখন মাঠে সক্রিয়। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামের রাজনীতির মাঠও এখন অনেকটা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী শূন্য। বর্তমান অনুকূল পরিস্থিতিতে এমন অনেক বিএনপি নেতা আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় যাতায়াত শুরু করেছেন যারা আওয়ামী লীগ আমলের ১৫ বছরে এলাকায় দলীয় কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য সামলেছেন কিংবা বিদেশে কাটিয়েছেন।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলা মোট ১৬টি সংসদীয় আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হওয়ার মনোবাসনা নিয়ে অন্তত চার ডজন নেতা মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে আগামী নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অন্তত দুজন নেতা মাঠে তৎপর রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল। ৫ আগস্টের পর একাধিক মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার হয়ে তিনি এখন কারাবন্দি। তার অনুসারীরাও এখন এলাকায় পুরোপুরি কোণঠাসা। এই আসনটি থেকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিন ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম চৌধুরী।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার আলমগীর, ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আজিম উল্লাহ বাহার, বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী। তাদের মধ্যে সরোয়ার আলমগীর ও আজিম উল্লাহ বাহার দুজনই এলাকায় নিয়মিত কর্মসূচি নিয়ে মাঠের অবস্থান পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মাঠে রয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা, বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মিল্টন ভূঁইয়া, মোস্তফা কামাল বাবুল ও তরিকুল ইসলাম তেনজিংয়ের নাম রয়েছে আলোচনায়।
তবে বিএনপির নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ব্যতিক্রম চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকু-) আসন। সেখানে দীর্ঘদিনের কারা নির্যাতিত নেতা বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী অনেকটা একক নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন এলাকার নেতাকর্মীদের কাছে।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক, দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মীর হেলাল ও প্রয়াত বিএনপি নেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে সাকিলা ফারজানার নাম আলোচনায় রয়েছে। তিনজনই এলাকায় নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মন জয় করার চেষ্টায় রয়েছেন।
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সামির কাদের চৌধুরী। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সেখানে ৫ আগস্টের পর থেকে গোলাম আকবর ও গিয়াস কাদের গ্রুপের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। গত পাঁচ মাসে দুই গ্রুপে প্রায় অর্ধশত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে সেখানে।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী ও সদস্য সচিব আবু আহমেদ হাসনাত। এলাকায় তিনজনেরই ভালো সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে বলে এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী ও মহানগরীর একাংশ নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ আসন। একসময় এ আসনে বিএনপির জাঁদরেল প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় থাকতেন সাবেক এমপি এম. মোরশেদ খান। আসনটি থেকে এবার বিএনপির মনোনয়ন লড়াইয়ে থাকতে পারেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান। মাঠে তৎপরতা রয়েছে দুজনেরই।
চট্টগ্রাম মহানগরীর আলোচিত আসন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি)। আসনটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মীর মো. নাসির উদ্দিন, দলের কেন্দ্রীয় সদস্য শামসুল আলম ও মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলের দুই হেভিওয়েট নেতা স্থানীয় কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ আল নোমান। এ আসনে আবদুল্লাহ আল নোমানের পুত্র সাঈদ আল নোমানের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর একক নিয়ন্ত্রণেই থাকছে। এ আসন থেকে তিনি অথবা তার পুত্র দলের পররাষ্ট্র উপকমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু মাহমুদ চৌধুরী দলের প্রার্থী হতে পারেন বলে আলোচনায় রয়েছে।
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন সাবেক এমপি গাজী শাহজাহান জুয়েল, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদ। পটিয়া বিএনপির রাজনীতিতে জুয়েল ও এনামের রয়েছে পৃথক বলয়। অতীতে বিভিন্ন সময় এই দুই গ্রুপের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির চার নেতা। তারা হলেন সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজাম, জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান, আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে অন্তত চারজনের নাম বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছে। তারা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় পরিবার পরিকল্পনা সম্পাদক প্রফেসর মহসিন জিল্লুর করিম, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মিজানুল হক, সাবেক ছাত্রদল নেতা এম এ হাশেম রাজু ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আনোয়ার।
চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে মাঠে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মহিউদ্দিন, মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান, লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিন ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জামাল হোসেন।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর দুই ছেলে জহিরুল ইসলাম চৌধুরী ও মিশকাতুল চৌধুরী আলোচনায় রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। পাশাপাশি জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম হোসাইনী ও সাবেক সদস্য লেয়াকত আলী চেয়ারম্যান পুরোদমে মাঠে রয়েছেন।
১৬ আসনে নতুন ভোটার ৮৭ হাজার : এদিকে সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বিগত সংসদ নির্বাচনের পর চট্টগ্রামের ১৬ আসনে নতুন ভোটার হয়েছেন ৮৭ হাজার ৩৬৩ জন। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৫৩ জন পুরুষ, ২৭ হাজার ৩০৮ জন নারী ও ৬০ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী জানান, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ ৫৭ হাজার ২২৫ জন। এর মধ্যে ৩৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬ জন পুরুষ, ৩১ লাখ ৪ হাজার ৬৯ জন নারী ও ৬০ জন হিজড়া রয়েছেন।