কোরআনের সমৃদ্ধ ও জ্ঞানগর্ভ শিক্ষা বিভিন্ন দিক থেকে লক্ষণীয়। এর শিক্ষাই আমাদের জন্য সেরা পথপ্রদর্শক। কোরআনের এসব শিক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক দোয়ার কথা বলা হয়েছে। কোরআনে নবী ও রাসুলদের দোয়া এবং তাদের আচার-আচরণ উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে। এই দোয়াগুলো কোরআনে অত্যন্ত সুন্দর ও মনোমুগ্ধকরভাবে পেশ করা হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত নবী ও রাসুলদের দোয়াগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
হজরত আদম ও হাওয়া (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজ সত্তার উপর জুলুম করে ফেলেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অকৃতকার্যদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ২৩)
হজরত নুহ (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমার প্রতিপালক! এই কাফেরদের মধ্য হতে কোনো বাসিন্দাকেই পৃথিবীতে বাকি রাখবেন না। আপনি তাদের বাকি রাখলে তারা আপনার বান্দাদের বিপথগামী করবে এবং তাদের যে সন্তান জন্ম নেবে, তারাও পাপিষ্ঠ ও ঘোর কাফেরই হবে।’ (সুরা নুহ, আয়াত ২৬-২৭)
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা করে দিন আমার পিতামাতা এবং প্রত্যেক এমন ব্যক্তিকে, যে ইমানের অবস্থায় আমার ঘরে প্রবেশ করেছে। আর সমস্ত মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকেও। আর যারা জালেম তাদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন।’ (সুরা নুহ, আয়াত ২৮)
‘হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, ভবিষ্যতে আপনার কাছে তা চাওয়া হতে আমি আপনার আশ্রয় চাই। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং আমার প্রতি দয়া না করেন, তবে আমিও ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা হুদ, আয়াত ৪৭)
হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনারই ওপর নির্ভর করেছি, আপনারই দিকে আমরা মুখাপেক্ষী এবং আপনারই কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত ৪)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে কাফেরদের পরীক্ষার পাত্র বানাবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই কেবল আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত ৫)
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে হেকমত দান করুন, আমাকে নেককার লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন, পরবর্তীকালীন লোকদের মধ্যে আমার পক্ষে এমন রসনা সৃষ্টি করুন, যা আমার সততার সাক্ষ্য দেবে। আমাকে সেই সব লোকের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা হবে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতের অধিকারী। আমার পিতাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই তিনি পথভ্রষ্টদের একজন। আমাকে সেই দিন লাঞ্ছিত করবেন না, যেদিন মানুষকে পুনরায় জীবিত করা হবে। যেদিন কোনো অর্থ-সম্পদ কাজে আসবে না এবং সন্তানসন্ততিও না। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে সুস্থ মন নিয়ে (সে মুক্তি পাবে)।’ (সুরা শুআরা, আয়াত ৮৩-৮৯)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পক্ষ হতে এ সেবা (বায়তুল্লাহ নির্মাণ) কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি এবং কেবল আপনিই সব কিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১২৭)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের আপনার একান্ত অনুগত বানিয়ে নিন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্যেও এমন উম্মত সৃষ্টি করুন, যারা আপনার একান্ত অনুগত হবে। আমাদের আমাদের ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দিন। আমাদের তওবা কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি এবং কেবল আপনিই ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ার মালিক।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১২৮)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যে কাজ লুকিয়ে করি তাও আপনি জানেন এবং যে কাজ প্রকাশ্যে করি তাও। পৃথিবীতে যা আছে সেগুলোর কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না এবং আকাশে যা কিছু আছে তাও না।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ৩৮)
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকেও নামাজ কায়েমকারী বানিয়ে দিন এবং আমার সন্তানদের মধ্য হতেও (এমন লোক সৃষ্টি করুন, যারা নামাজ কায়েম করবে)। হে আমাদের প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করে নিন। হে আমার প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সব ইমানদারকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ৪০-৪১)
হজরত আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমার প্রতিপালক! আমার এই কষ্ট (কঠিন পীড়া) দেখা দিয়েছে এবং আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৩)
‘হে আমার প্রতিপালক! শয়তান তো আমাকে (এক ব্যাধিতে) যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে।’ (সুরা ছোয়াদ, আয়াত ৪১)
হজরত ইউসুফ (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছেন এবং আমাকে বিভিন্ন তাৎপর্যসহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছেন। হে নভোম-ল ও ভূ-ম-লের স্রষ্টা! আপনিই আমার কার্যনির্বাহী ইহকাল ও পরকালে। আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে স্বজনদের সঙ্গে মিলিত করুন।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত ১০১)
হজরত শোয়াইব (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায্যভাবে ফয়সালা করে দিন। আপনিই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ৮৯)
হজরত মুসা (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজ সত্তার প্রতি জুলুম করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। হে আমার প্রতিপালক! আপনি যেহেতু আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তাই ভবিষ্যতে আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না।’ (সুরা আল কাসাস, আয়াত ১৬-১৭)
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে জালেম সম্প্রদায়ের থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আল কাসাস, আয়াত ২১)
‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ বর্ষণ করবে, আমি সেটার ভিখারি।’ (সুরা আল কাসাস, আয়াত ২৪)
হজরত সুলাইমান (আ.)-এর দোয়া
‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি তুমি যে অনুগ্রহ করেছো, সেটার জন্য এবং যাতে আমি সৎকাজ করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করো এবং তোমার অনুগ্রহে আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের শামিল করো।’ (সুরা নামল, আয়াত ১৯)
হজরত রাসুল (সা.)-এর দোয়া
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দান করো দুনিয়াতেও কল্যাণ এবং আখিরাতেও কল্যাণ এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২০১)
অন্যান্য দোয়া
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি সেই রকমের দায়িত্বভার অর্পণ করো না, যেমন তা অর্পণ করেছিলে আমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ওপর এমন ভার চাপিয়ো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের (ত্রুটিগুলো) মার্জনা করো, আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের অভিভাবক ও সাহায্যকারী। সুতরাং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৮৬)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ করো না এবং তোমার কাছ থেকে আমাদের রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি মানবজাতিকে একদিন একত্রে সমবেত করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৮-৯)
‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি এসব উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। আপনি (এমন অনর্থক কাজ থেকে) পবিত্র। সুতরাং আপনি আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১)
‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ইমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ইমান আনো। তাই আমরা ইমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সব গুনাহ মাফ করো এবং আমাদের সব দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সঙ্গে। হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার রাসুলগণের মাধ্যমে আমাদের যা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছো, তা আমাদের দাও এবং কেয়ামতের দিন আমাদের হেয় করো না। নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করো না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯৩-১৯৪)